ডেস্ক।।ব্যাংকবীমা২৪.কম

সেপ্টেম্বর ৮, ২০২০

ইউএনওর ওপর হামলা কি বালু বাণিজ্য?

দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও তাঁর বাবার ওপর চুরি করতে গিয়ে হামলা হয়েছে চাউর করা হলেও পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে এটিকে ‘গল্প’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন সবাই। ‘চুরির জন্য এই হামলা’ এমন গল্প বিশ্বাস করতে পারছেন না কেউই। স্থানীয় প্রশাসন মনে করছে, এ ঘটনার মধ্যে গভীর কিছু লুকিয়ে আছে। বালুমহাল বন্ধের জেরের বিষয়টিও এই বর্বরোচিত হামলার অন্যতম কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। এদিকে এই ঘটনা নিয়ে নানা আলোচনায় স্থানীয় সংসদ সদস্যের (এমপি) সঙ্গে যুবলীগ নেতাদের বিরোধের বিষয়টিও উঠে আসছে।

বালুমহাল নিয়ে আলোচনা :

ঘোড়াঘাটে সরকারি মহাল না থাকলেও কমপক্ষে ১১ স্থান থেকে বালু তোলা হয় বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। এই বালু তোলার সঙ্গে জড়িত স্থানীয় প্রভাবশালীরা। বালুমহালে থাকা অবৈধ ড্রেজার মেশিন পুড়িয়ে দেওয়াসহ ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছেন ইউএনও ওয়াহিদা। স্থানীয়রা জানায়, এই বালুমহালগুলোর সঙ্গে জড়িত যুবলীগ নেতা জাহাঙ্গীর ও আসাদুল। পরে এর সঙ্গে যুক্ত হন আরেক যুবলীগ নেতা মাসুদ রানা। তাঁদের সঙ্গে উপজেলার এক আওয়ামী লীগ নেতার যোগসূত্র রয়েছে। তবে বিষয়টি নিয়ে মাসুদ রানা বলেন সংবাদমাধ্যমকে, ‘জাহাঙ্গীর ও আমি একসঙ্গে বালু তুলতাম। পরে তা না হওয়ায় বালু তোলা বন্ধ করে দিই। এখানে শুধু আমরা নই, অবৈধভাবে আওয়ামী লীগের লোকজনসহ অন্যান্য দলের লোকরাও বালু তোলেন।’

ঘোড়াঘাটের পৌর মেয়র আব্দুস সাত্তার মিলন বলেন, ‘আমার জানা মতে জাহাঙ্গীর ও তার সহযোগীদের অধীনে দুটি বালুমহাল আছে। আর তাদের সঙ্গে স্থানীয় আরো লোকজন জড়িত। ইউএনওর বাবা এখানে ২০ লাখ টাকার জমি কিনেছেন বলে আমি শুনেছি।’

ঘোড়াঘাট উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুর রাফে খন্দকার বলেন, ‘এই উপজেলায় কোনো বালুমহাল নেই, ইজারাও হয়নি। বালু তোলার বিষয়ে কিছু জানা নেই। জাহাঙ্গীরদের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। এটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রচার করা হচ্ছে।’

ঘোড়াঘাট থানার ওসি আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘অবৈধ বালুমহালের বিরুদ্ধে ইউএনও একাধিকবার অভিযান চালিয়েছেন। তবে ইউএনওর ওপর হামলার ঘটনায় বালুমহালের বিষয়টি জিজ্ঞাসাবাদের মধ্যে আসেনি। সর্বশেষ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য উপজেলা ভূমি অফিসের গাড়িচালক ইয়াসিন আলী ও ইউএনও অফিসের পরিচ্ছন্নতাকর্মী অরসোলা হেমব্রমকে আটক করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে যা পাওয়া যাচ্ছে তা মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে জানানো হচ্ছে।’

দিনাজপুর জেলা প্রশাসক মাহমুদুল আলম বলেন, ‘যথেষ্ট পরিমাণে আলামতের ভিত্তিতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে। আমি মনে করি, একজন ইউএনওর ওপর হামলা মানে রাষ্ট্রের ওপর হামলা।’

স্থানীয় সংসদ সদস্য শিবলী সাদিক বলেন, ‘অনেকেই অবৈধভাবে নদী থেকে বালু তুলছে। তবে তাদের সুনির্দিষ্ট নাম জানা নেই। এসব বিষয়ে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই। তবে জাহাঙ্গীর ও তার সহযোগীরা আমার ওপরও হামলার পরিকল্পনা করেছিল। ওই সময় তাদেরকে পুলিশ আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করে।’

ধোপে টিকছে না ‘চুরির গল্প’
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ঘোড়াঘাটের ইউএনও ওয়াহিদা খানম গত ২৭ থেকে ৩০ আগস্ট পর্যন্ত চার দিনের ছুটিতে নিজ গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলেন। ৩১ আগস্ট তিনি কর্মস্থলে যোগ দেন। সেই সময় ফাঁকা বাসায় চুরি হওয়ার মতো অনেক মালপত্র ছিল। কিন্তু তখন চুরি না হয়ে বাসায় তাঁর উপস্থিতিতে চুরি করতে যাওয়ার বিষয়টি বিশ্বাসযোগ্যতা পাচ্ছে না। এ ছাড়া সিসি ক্যামেরায় দেখা যায়, দুজন ব্যক্তি রাত ১টা ১৮ মিনিটে ঢোকে। এর মধ্যে একবার বের হয়ে ফের তারা বাড়িতে প্রবেশ করে। সর্বশেষ তারা একেবারেই বের হয়ে যায় ৪টা ৪১ মিনিটে। এর মধ্যে চুরি করে নিয়ে যাওয়ার মতো কোনো দৃশ্য নেই। ইউএনওর বাসা থেকেও কিছু খোয়া যায়নি।

এদিকে ইউএনও ওয়াহিদার ওপর হামলার ঘটনার পর পাঁচ দিন পার হলেও এখনো বিভাগীয় কমিশনারের গঠন করা তদন্ত কমিটি তাদের কাজ শুরু করেনি। গতকাল সোমবার দুপুরে দিনাজপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘তদন্ত কমিটি গঠনের চিঠি পেয়েছি। তবে আহ্বায়ক কবে তদন্ত শুরু করবেন সে ব্যাপারে কোনো চিঠি পাননি।’

জানা যায়, ইউএনও ওয়াহিদার অনুপস্থিতিতে ঘোড়াঘাট উপজেলার দাপ্তরিক কাজ করার জন্য হাকিমপুরের ইউএনও আব্দুর রাফিউল আলমকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আর আইন-শৃঙ্খলার তদারকিসহ সার্বক্ষণিকভাবে দায়িত্ব পালন করছেন জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেট শাহানুর রহমান।

রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হলেও এই মামলার কথিত প্রধান আসামি আসাদুল ইসলাম এখনো সুস্থ নয় বলে জানা গেছে।