ড. মাহফুজ পারভেজ

মে ১৬, ২০২১

আরব-ইহুদি মৈত্রীর খেসারত শত শত লাশ!

ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে আসছে রকেট, মর্টার। আকাশ থেকে বোমাবর্ষণ করে চলেছে বোমারু বিমান। গাজার অধিকাংশ বাড়িই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে সেই ধ্বংসযজ্ঞে। তাই প্রাণ বাঁচাতে একমাত্র ভরসা শরণার্থী শিবির। ইসরায়েলি আক্রমণ থেকে বাঁচতে ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছিলেন ১০ হাজার প্যালেস্টাইনি। কিন্তু সেখানেও শেষ রক্ষা হল না। বিমান হামলায় গুঁড়িয়ে গেল সেই ক্যাম্পও। প্রাণ গেল একই পরিবারের দুই মহিলা-সহ আট জন শিশুর।

ধ্বংস করে দেওয়া হলো আন্তর্জাতিক মিডিয়া দফতর। গাজা ও পশ্চিম তীরের সাধারণ নাগরিকদেরও। সবশেষ হিসাবে শতাধিক মানুষের জীবন গিয়েছে। ইসরায়েলি একতরফা আক্রমণ পরিণত হয়েছে প্রকাশ্য গণহত্যায়, যা থেকে পালাতে প্রাণ ভয়ে ছুটছে আরব, ফিলিস্তিনি, লেবাননিজ নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ তথা সর্বস্তরের জনতা।

১৯৪৭ সালে অবৈধ দখলদার ইহুদি রাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে জবরদখলের পর এতো একতরফা, এতো আগ্রাসী, এতো প্রতিরোধহীনভাবে গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের সুযোগ পায়নি। ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়ার আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সে সুযোগ এনে দিয়েছেন ইসরায়েলকে। বশংবদ আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে মৈত্রীর বন্ধনে আবদ্ধ করেছেন ইহুদিদের, যারা এখন মুসলিম ভাইদের গণহত্যার নিরব দর্শক। মধ্যপ্রাচ্যে মুসলমানদের মধ্যকার বিভেদ ও মেরুকরণের পুরো ফায়দা তুলছে ইসরায়েল। ইরান-সিরিয়া-লেবাননের শিয়া গোষ্ঠীর সঙ্গে সৌদি নেতৃত্বাধীন সুন্নি আরব দেশগুলোর দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়েছে ইসরায়েল। মুসলমানদের একপক্ষকে পাশে নিয়ে নিধন করছে মুসলমানদেরই অন্যপক্ষকে।

মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর আরব ঐক্যকে প্রথমে ভাগ করে দুর্বল করেছে মার্কিন-ইহুদি অক্ষশক্তি। তারপর একটা একটা করে ধরছে। এবার একপক্ষকে নিকেশ করতে পারলে পরে সুযোগ বুঝে অন্যপক্ষকে সাফ করে দেওয়া যাবে। বস্তুতপক্ষ আরব-ইহুদি মৈত্রীর খেসারত দিচ্ছে স্বাধীনতাকামী মানুষ। তাদের একমাত্র প্রাপ্তি হলো শত শত স্বজনের লাশ আর নির্বিচার গণহত্যার মাধ্যমে জান, মাল, ইজ্জত, আব্রু বিসর্জন।

তথাকথিত সংষর্ষ বলা হলেও এককভাবে নৃশংসতা ও ধ্বংসলীলা চলাচ্ছে ইসরায়েল। সর্বাত্মক যুদ্ধের যাবতীয় মারণাস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে ইহুদিরা। হত্যা, ধর্ষণ, ধ্বংসের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে। গাজা উপত্যকা, পশ্চিম তীর পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে। গত পাঁচ-ছয় দিনের সংঘর্ষে  রক্ষা পাচ্ছে না প্যালেস্টাইনিদের কেউই। মারা যাচ্ছে শিবিরে সপরিবারে আশ্রয় গ্রহণকারী গাজার বাসিন্দা আবু হাতাব-এর পরিবারের মতো অসংখ্য নিরীহ পরিবার। ঘুমের মধ্যে ইহুদি হামলায় মরছে শত শত মানুষ, এমনকি ওমরের মতো সদ্যজাত শিশু।

ইহুদি হামলা থেকে রক্ষা পাচ্ছে না আশ্রয় শিবির, স্কুল, হাসপাতাল। অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র দিয়ে টার্গেট করে সামরিক-বেসামরিক সকল স্থাপনাকেই গুড়িয়ে দিচ্ছে ইসরাইলের সেনা ও বিমান বাহিনি। উন্মাদের মতো মারণযজ্ঞে মেতেছে ইহুদিরা।

আরব দেশগুলো মৌখিক প্রতিবাদ ছাড়া কিছুই করতে পারছে না। প্রতিবাদও ঐক্যবদ্ধ নয়, খণ্ডিত ও বিভক্ত। মিডিয়ায় ধ্বংসের ছবি, লাশের সারি, রক্তের স্রোত দেখে তথাকথিত বিশ্ববিবেক জাগ্রত হয়নি এখনও। কেউ জানে না, কখন থামবে ইসরাইলের ধ্বংসের উন্মত্তা, আর মুসলিম নিধনের পাশবিকতা আর রক্তের নেশা!

মনে হচ্ছে, একমাত্র সৃষ্টিকর্তার ঐশীশক্তি ছাড়া ইসরাইলি দমন-পীড়ন-হত্যা-ধ্বংসযজ্ঞ থামাতে পারবে না পৃথিবীর কোনও শক্তিই। অদৃশ্য কোনও কারণে, নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থে কিংবা আন্তর্জাতিক-আঞ্চলিক রাজনীতির মেরুকরণের মারপ্যাঁচে পৃথিবীর কেউই যেন মজলুম ও বিপন্ন মানবতাকে উদ্ধারে এগিয়ে আসবে না।

লেবাননের সিডার গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে, প্যালেস্টাইনের জলপাই বৃক্ষের সবুজ ও কচি পত্রালি সরিয়ে, পশ্চিম তীর ও গাজার দাক্ষাকুঞ্জের আড়াল থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ, নারী-পুরুষ-শিশু-বৃদ্ধ, আকাশের দিকে দুই হাত তুলে করুণ ও অসহায়ভাবে শুধু তাকিয়েই থাকবে, স্মরণকালের ভয়ঙ্কর গণহত্যার কবল থেকে বাঁচার জন্যে, অলৌকিক উদ্ধারের আশায় ও অপেক্ষায়।