সোহেল সানি

অক্টোবর ১৫, ২০১৮

কেমন আছেন ডাঃ মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন ?

মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন। রাজনীতিতে সুদর্শন, মিষ্টভাষী এক অনিন্দ্যসুন্দর  মুখ। সফল ক্রিকেটার থেকে রাজনীতে অভিষেক। সে স্বাধীনতাপূর্ব এক অধ্যায়।জগন্নাথ কলেজে এইচ এস সি ছাত্র। ক্রিকেটে তাঁর স্বপ্নরাঙা। প্রতিভাবান  মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনকে  রাজনীতিতে জড়ানোর সেই স্মৃতিটা বড়ই মধুর আবার  বড়ই বেদনা বিদুর। শেখ মুজিবুর রহমান তখনো
বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠেননি, তবে  যেন হয়ে ওঠার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছেন সবার অলক্ষ্যে। জগন্নাথ কলেজ  চত্বরে শেখ কামালের চোখে পড়েই তাঁর রাজনীতিতে নাম লেখানো। ঢাকা  বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ডাকসু’র পর জগন্নাথ কলেজ ছাত্র সংসদই  ছাত্ররাজনীতিতে অতিশয় প্রভাব রাখতো। সে কারণে এর প্যানেল তৈরির বিষয়টিও ছিল  গুরুত্বপূর্ন। জগন্নাথ কলেজ চত্বরে শেখ কামালের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ  হয়েছিলেন তরুণ টগবগে মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন। ক্রিকেটার হিসাবে তাঁর বিশেষ  খ্যাতি বিরাট ভুমিকা রাখে। শেখ মুজিব পুত্র শেখ কামাল তাঁকে জিএস পদে  মনোনীত করে। আর এভাবেই ছাত্রলীগের রাজনীতিতে হাতেখড়িটা হয়ে যায় তাঁর।  আওয়ামী লীগ প্রধান
শেখ মুজিবের ঘোষিত বাঙালী মুক্তির সনদ ঐতিহাসিক ৬  দফার সঙ্গে ডাকসু ভিপি তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বাধীন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের  ১১ দফা একাকার হয়ে যে ছাত্র আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানের সৃষ্টি করে তার নেপথ্যে  মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনের বিরাট ভুমিকা ছিল। শেখ ফজলুল হক মনি ও তোফায়েল  আহমেদের প্রিয়ভাজন হিসাবেও তাঁর একটা বিশেষ পরিচিতি গড়ে উঠেছিল ছাত্রলীগের  অভ্যন্তরে। যেদিন ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি
তোফায়েল আহমেদ বাংলার অবিসংবাদী নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধী দেন, সেদিনও অতি কাছে ছিলেন মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন।
১৯৭০ সালে ডাকসু ভি পি তোফায়েল আহমেদকে সভাপতি ও আসম আব্দুর রবকে সাধারণ  সম্পাদক করে ছাত্রলীগের কমিটি হলে তাতে ঠাঁই পান প্রতিশ্রুতিশীল ছাত্রনেতা  জালল মহিউদ্দিন। এরপর মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ। ১৯৭১ সালের ২৭ নভেম্বর  মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনকে না পেয়ে বাসা হতে  বড় ভাইকে ধরে নিয়ে যায় আল বদর  বাহিনী। তারপর থেকে মেলেনি তাঁর লাশও।
১৯৭৩ সালে বীর মুক্তিযোদ্ধা  জালাল মহিউদ্দিন ছাত্রলীগের সমেলনে যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৭৪ সালে  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সেভেন মার্ডার’ সংঘটিত হয়। এর দায়ে শফিউল আলম প্রধান  বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে শুধু বহিস্কার হন। জাতির পিতা  বঙ্গবন্ধু’র নির্দেশে বিচারে সোপর্দ হয়ে কারাগারে নিক্ষিপ্তই শুধু নয়,  কারাদণ্ড লাভ করেন।
সংগঠনের সভাপতি মনিরুল হক চৌধুরীর সঙ্গে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসাবে দায়িত্বগ্রহণ করেছিলেন মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন।
বলা বাহুল্য মনিরুল হক চৌধুরীও বঙ্গবন্ধু’র আদর্শের পতাকাবাহী ছাত্রসংগঠন  ছাত্রলীগের সুবাদে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নয়, এরশাদ জামানায় জাতীয় পার্টিতে  ভিড়ে চীফ হুইপ হয়েছিলেন। জাতীয় পার্টির পাঠ চুকিয়ে এখন বিএনপি’তে।
‘৬৯  এর গণঅভ্যুত্থান কালীন মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন জগন্নাথ কলেজের জিএস  হিসাবে অগ্রণী ভুমিকা পালন করে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে লাইম লাইটে উঠে আসেন।  ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করা ডাঃ মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন ১৯৭৪ সালে  ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ও পরবর্তীতে সহ সভাপতি হন। ১৯৮৩ সালে আওয়ামী  লীগ যখন নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে ভাঙ্গনের মুখে তখন আওয়ামী লীগ সভাপতি  বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনকে ছাত্রলীগের সভাপতি  নির্বাচিত করেন। এস্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলেন সাধারণ সম্পাদক আখম  জাহাঙ্গীর হোসাইনের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে।
বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার  নেতা হত্যার পর আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগ করা যখন নেতাকর্মীদের জন্য কঠিন হয়ে  পড়ে, তখনও ডাঃ জালাল ছিলেন গোপনে তৎপর। জেলহত্যা কান্ড সংঘটিত হওয়ার খবরে  বিমর্ষ হয়ে পড়া মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন পুরানো ঢাকার বাড়ি হতে নেমে পড়েন  রাজপথে। ছুটে যান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে। মুজিব নগর সরকারের  অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের মরদেহ নিয়ে যান পুরানো ঢাকার আরমানী  টোলা ময়দানে। ওখানে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার গায়েবানা জানাজার আয়োজন  করে এক দুঃসাহসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন ডাঃ মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন।
বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার ছবি বুকে ধারণ করে সেদিন ছাত্র নেতাদের মধ্যে  যে কজন বীর রাজপথে মিছিল বের করে বঙ্গবন্ধু’র ঐতিহাসিক ৩২ নম্বর সড়কের  বাসভবন অভিমুখে যাত্রা করেছিলেন, তাদের ডাঃ মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন ছাড়াও  ছিলেন, স্বাধীনতাত্তোর ডাকসু’র প্রথম ভিপি ছাত্র ইউনিয়ন নেতা মোজাহিদুল  ইসলাম সেলিম, স্বাধীনতাত্তোর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ইসমাত কাদির গামা  (শাজাহান সিরাজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক পদ হতে বহিস্কৃত হলে ইসমাত কাদির  গামাকে সরাসরি ওই পদে আসীন করা হয়), সালাউদ্দিন ইউসুফ (৯৬-০১ শেখ হাসিনা  মন্তিসভার সদস্য) প্রমুখ নেতা। ডাঃ জালাল আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয়  রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ছাত্রলীগের রাজনীতি থেকে  বিদায়ের পর পরই আওয়ামী লীগের সহ প্রচার সম্পাদক হিসাবে প্রচার সম্পাদক  মোহাম্মদ নাসিমের সঙ্গে জুটি বাঁধেন। ‘৮৭- ‘৯২ সাল পর্যন্ত এ পদেই আসীন  ছিলেন। বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশান বিএমএ’র মহাসচিব ডাঃ জালালকে ‘৯২ সালের  কাউন্সিলে আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। ‘৯৭ এবং ‘০২  সালের কাউন্সিলেও ডাঃ মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্য  সম্পাদক হন।
বিএমএ’র বর্তমান সভাপতি ডাঃ জালাল।
‘০৮ সালের দশম  সংসদ নির্বাচনে লালবাগ থেকে বিএনপি প্রার্থী নাসির উদ্দিন পিন্টুর বিরুদ্ধে  ৭৭ হাজার ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হন তিনি। আসন্ন একাদশ নির্বাচনেও আওয়ামী  লীগের প্রার্থী তিনি। বিএমএ’ তিন বারের মহাসচিব ডাঃ মোস্তফা জালাল  মহিউদ্দিন বর্তমানে নির্বাচনী প্রচারাভিযানেই ব্যস্ত সময় পার করছেন।