স্টাফ করেসপন্ডেন্ট।।ব্যাংকবীমা২৪.কম

অক্টোবর ৪, ২০১৮

দুশ্চিন্তা বাড়াচ্ছে জ্বালানি তেল

বিশ্ববাজারে অল্প অল্প করে হলেও বাড়ছে জ্বালানি তেলের দাম। একই সঙ্গে দেশে বাড়ছে এর ব্যবহার ও আমদানি। জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনে এ বছর প্রায় আট হাজার কোটি টাকা (প্রায় ১ বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ডলার) লোকসানের আশঙ্কা করছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।

বিপিসির সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে তাদের যে তেলের চালান এসেছিল, তাতে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম পড়েছিল ৪৩ দশমিক ১৭ ডলার। আর গত আগস্টে তারা আমদানি করেছে প্রতি ব্যারেল ৮১ দশমিক ৫১ ডলারে।

২০১৬ পর্যন্ত বিপিসি অবশ্য মুনাফা করেছিল প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। তখনো জ্বালানি তেলের মূল্য তেমন কমানো হয়নি। আমদানি করা জ্বালানি তেলের অর্ধেকের বেশি ডিজেল। ২০১৬ সালের এপ্রিলে প্রতি ব্যারেল ডিজেল আমদানি করা হয়েছে ৫০ দশমিক ৩০ ডলারে।

গত আগস্টে সেই দাম বেড়ে হয়েছে ৯১ দশমিক ৭০ ডলার। বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা এখনো অব্যাহত রয়েছে। তবে সরকারি-বেসরকারি খাতের অনেকের ধারণা, আগামী নভেম্বর-ডিসেম্বরে জ্বালানি তেলের দাম কমতে শুরু করবে।

এব্যাপারে বিশিষ্ট জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, জ্বালানি তেলের দাম কখন বাড়বে, আর কখন কমবে, তা অনুমান করা খুব কঠিন।

বিশ্বব্যাংকসহ অনেকেরই পূর্বাভাস ছিল আগামী ডিসেম্বর নাগাদ দাম ৮০ ডলারে উঠবে। কিন্তু সেপ্টেম্বরেই ৮০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। আবার ইরানের সঙ্গে ইউরোপের চুক্তি হলেই দাম কমতে শুরু করবে। এই দাম কমা-বাড়ার বিষয়ে বাংলাদেশের কিছু করার নেই।

বাংলাদেশের যেটা করা দরকার, সেট হলো নিজেদের জ্বালানিসম্পদ আহরণে ও ব্যবহারের পরিমাণ বাড়ানো। তেলের দাম প্রায় দুই বছর অনেক কম ছিল। ওই সময়ের মধ্যে নিজেদের সম্পদ আহরণের হার বাড়াতে পারলে এখনকার মূল্যবৃদ্ধি গায়ে লাগত না। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা নিজেদের জ্বালানিসম্পদ অনুসন্ধান ও আহরণ বাড়াতে না পারা।

বর্তমান দামে প্রতি লিটার ডিজেলে বিপিসির লোকসান হচ্ছে প্রায় ৯ টাকা। আর প্রতি লিটার ফার্নেস অয়েলে লোকসান ১২ টাকার বেশি। সব মিলে বর্তমানে বিপিসির প্রতিদিনের লোকসান প্রায় ২০ কোটি টাকা। মাসে লোকসান হচ্ছে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা।

প্রায় তিন বছর ধরে দেশে অকটেন ও পেট্রল আমদানি করতে হচ্ছে না। দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে গ্যাসের উপজাত হিসেবে পাওয়া কনডেনসেট দিয়ে দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে চাহিদার শতভাগ অকটেন-পেট্রল। ফলে এই দুটি পণ্যে সরকারের মুনাফা হচ্ছে।

মূল্যবৃদ্ধির কারণে ডিজেলচালিত কেন্দ্রগুলোতে উৎপাদিত প্রতি ইউনিট (এক কিলোওয়াট ঘণ্টা) বিদ্যুতের দাম পড়ছে এখন প্রায় ১৫ টাকা, যা ২০১৬ সালে ছিল ৯ টাকার মতো। আর ফার্নেস অয়েলচালিত কেন্দ্রগুলোতে উৎপাদিত প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম এখন পড়ছে প্রায় ১০ টাকা, যা প্রায় পাঁচ টাকায় নেমেছিল।

২০১৬ সালে দেশে জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়েছে ৬৪ লাখ টনের মতো। ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় এ বছর আমদানি করতে হবে ৭০ লাখ টনের কিছু বেশি। আর আগামী বছর আমদানির পূর্বাভাস হচ্ছে ৭৫ লাখ টন।

এব্যাপারে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, এর ফলে রাষ্ট্রীয় কোষাগার ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ছে ঠিকই। আবার এসব জ্বালানি ব্যবহারে জাতীয় উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধিও বাড়ছে। তবে জ্বালানির দাম না বাড়লে দেশের জন্য আরও ভালো হতো।

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সূত্রে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রায় চার দশক আগে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) গঠিত হওয়ার পর থেকে চলতি আগস্ট পর্যন্ত ৪০ বছরের মধ্যে বিপিসি লোকসান দিয়েছে ২০ বছর। আর ২০ বছর মুনাফা করেছে।

এই লাভ-লোকসান সমন্বয় করার জন্য সরকার বিপিসিকে ভর্তুকি বা ঋণ হিসেবে দিয়েছে ৩৯ হাজার কোটি টাকা। আর বিপিসির কাছ থেকে শুল্ক, কর ও মূসক বাবদ মোট নিয়েছে ৭৫ হাজার ৫৫২ কোটি টাকা।

এ ছাড়া ২০১৪-১৫ সাল পর্যন্ত বিপিসির যে মুনাফা হয়েছে, তার ওপর থেকে লভ্যাংশ (ডিভিডেন্ট) হিসেবে সরকার আরও নিয়েছে ১ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকা। ২০১৪ সালের জুন থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম অব্যাহতভাবে কমতে থাকে।

এই দাম কমার সুযোগ নিয়ে বিপিসি মুনাফা করেছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। এ থেকেও সরকার প্রায় আট হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পেয়েছে।

সরকারি-বেসরকারি সূত্রে জানা গেছে, দাম যতই বাড়ুক, নির্বাচন সামনে রেখে সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়াবে না। পলিটিক্যাল সাবসিডি দিয়ে চলবে। তবে অপেক্ষাকৃত কম দামের সুযোগে বাংলাদেশ থেকে ভারতে জ্বালানি তেল পাচাৃর হয় কি না, সে বিষয়ে বিশেষ নজরদারি দরকার। তা না হলে রাষ্ট্রীয় কোষাগার ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ আরও বাড়বে।