সাহাদত হোসেন খান

সেপ্টেম্বর ১, ২০১৮

কেবিনেট মিশন প্লান ভারত অখন্ডের প্রয়াস

কেবিনেট মিশন ছিল ভারতকে অখণ্ড রাখার শেষ প্রয়াস। ঐতিহাসিকগণ এ মিশনকে একটি ‘মিসজড অপরচুনিটি’ বা হারানো সুযোগ হিসাবে বর্ণনা করেছেন। পাকিস্তান দাবির প্রেক্ষিতে ব্রিটিশ সরকার কেবিনেট মিশন পাঠায়। ব্রিটিশরা ভেবে দেখতে পায় যে, ভারতের দু’প্রান্তে হাজার মাইলের ব্যবধানে দু’টি পৃথক ভূখণ্ড নিয়ে একটি রাষ্ট্র গঠন করা হলে তাদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করা কঠিন হবে। নিরাপত্তা বজায় রাখাও সম্ভব হবে না।

তাই ভারত অখণ্ড রাখাই উত্তম। এ লক্ষ্য নিয়েই শেষ মুহূর্তে কেবিনেট মিশন পাঠানো হয়। কেবিনেট মিশনের প্রস্তাব মেনে নেয়া হলে ভারত কখনো বিভক্ত হতো না। মহাত্মা গান্ধী ও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ভূমিকা ইতিবাচক হলেও কংগ্রেস সভাপতি জওহরলাল নেহরুর ভূমিকা ছিল নেতিবাচক। এই একটি লোকের একটি উক্তির জন্য ব্রিটিশ ভারতকে দ্বিখন্ডিত করা হয়।
ভারতীয় নেতৃত্বের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং ডোমিনিয়নের আওতায় ভারতকে স্বাধীনতা প্রদান করাই ছিল কেবিনেট মিশন পাঠানোর লক্ষ্য। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট এটলির উদ্যোগে গঠিত এ মিশনে ছিলেন ভারত সচিব লর্ড পেথিক লরেন্স, বাণিজ্য বোর্ডের সভাপতি স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপস এবং এডমিরাল্টির ফার্স্ট লর্ড এ. ভি. আলেক্সান্ডার। ভারতের ভাইসরয় লর্ড ওয়াভেল মিশনের সদস্য ছিলেন না। এ মিশন ‘কেবিনেট মিশন’ নামে ইতিহাসে পরিচিত। ১৯৪৬ সালের ২ এপ্রিল মিশন দিল¬ীতে এসে পৌঁছায়। কেবিনেট মিশনের লক্ষ্য ছিল তিনটি। (১) সংবিধান প্রণয়নের পদ্ধতির ব্যাপারে একটি সমঝোতায় পৌঁছতে ব্রিটিশ ভারত ও ভারতীয় রাজ্যগুলোর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রস্তুতিমূলক আলোচনা অনুষ্ঠান। (২) একটি গণপরিষদ গঠন এবং (৩) ভারতের মূল রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে একটি নির্বাহী কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা।
মিশন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এবং নিখিল ভারত মুসলিম লীগের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় মিলিত হয়। এ দু’টি দল সাম্প্রদায়িক কলহ প্রতিরোধে হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগির শর্ত নিয়ে আপোস করার পরিকল্পনা করছিল। গান্ধী-নেহরুর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস নিরংকুশ ক্ষমতা লাভের চেষ্টা করছিল। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বাধীন নিখিল ভারত মুসলিম লীগ আইনসভায় সমতার নিশ্চয়তাসহ রাজনৈতিক রক্ষাকবচের শর্তে ভারতকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে চেয়েছিল। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনার পর ১৯৪৬ সালের ১৬ মে মিশন নয়া সরকার গঠনে তাদের পরিকল্পনা প্রকাশ করে। এ পরিকল্পনা ১৬ মে’র পরিকল্পনা নামে পরিচিত। পরিকল্পনায় বলা হয় :
(১) একটি ঐক্যবদ্ধ ভারত ডোমিনিয়নকে স্বাধীনতা প্রদান করা হবে।
(২) মুসলিমপ্রধান প্রদেশগুলোকে নিয়ে গ্র“প গঠন করা হবে।
(৩) মধ্য ও দক্ষিণ ভারতের হিন্দুপ্রধান মাদ্রাজ, বোম্বাই, ইউনাইটেড প্রভিন্স, বিহার, সেন্ট্রাল প্রভিন্স ও উড়িষ্যাকে নিয়ে গঠন করা হবে ‘ক’ গ্র“প।
(৪) বেলুচিস্তান, সিন্ধু, পাঞ্জাব ও উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশকে নিয়ে গঠন করা হবে ‘খ’ গ্র“প এবং বাংলা ও আসামকে নিয়ে গঠন করা হবে ‘গ’ গ্র“প।
(৫) কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকবে পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। অবশিষ্ট ক্ষমতা গ্র“পগুলোর কাছে অর্পণ করা হবে।
১৯৪১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী ভারতের পশ্চিম ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোর জনসংখ্যার একটি বিবরণ দেয়া হলো:
পশ্চিমাঞ্চল
প্রদেশ মুসলিম অমুসলিম
পাঞ্জাব ১ কোটি ৬২ লাখ ১৭ হাজার ২৬২ ১ কোটি ২২ লাখ ১,৫৭৭
সীমান্ত প্রদেশ ২৭ লাখ ৮৮ হাজার৭৯৭ ২ লাখ ৪৯ হাজার ২৭০
সিন্ধু ৩২ লাখ ৮ হাজার ৩২৫ ১৩ লাখ ২৬ হাজার ৬৮৩
বেলুচিস্তান ৪ লাখ ৩৮ হাজার ৯৩০ ৬২ হাজার ৭০১
মোট ২ কোটি ২৬ লাখ ৫৩,২৯৪ ১ কোটি ৩৮ লাখ ৪০,২৩১
শতাংশ ৬২.০৭ ৩৭.৯৩

উত্তর-পূর্বাঞ্চল
প্রদেশ মুসলিম অমুসলিম
বঙ্গদেশ ৩ কোটি ৩০ লাখ ৫,৪৩৪ ২ কোটি ৭৩ লাখ ১,০৯১
আসাম ৩৪ লাখ ৪২ হাজার ৪৭৯ ৬৭ লাখ ৬২ হাজার ২৫৪
মোট ৩ কোটি ৬৪ লাখ ৪৭,৯১৩ ৩ কোটি ৪০ লাখ ৬৩,২৪৫

পরিকল্পনায় বলা হয় যে, এসব গ্র“প বিভিন্ন প্রদেশের সঙ্গে পরামর্শক্রমে নিজেদের সংবিধানের খসড়া প্রণয়ন করবে এবং আইনসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সিদ্ধান্তে ১৫ বছর পর যে কোনো প্রদেশ ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে যেতে পারবে। ৩৮৯-সদস্যের একটি গণপরিষদ ভারতের সংবিধান রচনা করবে। ২৮৮ জন প্রতিনিধি নেয়া হবে প্রদেশগুলো থেকে, চারজন প্রতিনিধি নেয়া হবে চীফ কমিশনার শাসিত অঞ্চল থেকে এবং ৯৩ জন দেশীয় রাজ্য থেকে। হিন্দু ও মুসলিম প্রতিনিধিদের সমতার ভিত্তিতে সকল সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বমূলক একটি অর্š—বর্তী কেন্দ্রীয় সরকার গঠন করা হবে। নিচে প্রদেশগুলোতে আসন বণ্টনের একটি ছক দেয়া হলো:
‘ক’ গ্র“প
প্রদেশ সাধারণ মুসলিম মোট

মাদ্রাজ ৪৫ ৪ ৪৯
বোম্বাই ১৯ ২ ২১
ইউনাইটেড প্রভিন্স ৪৭ ৮ ৫৫
বিহার ৩১ ৫ ৩৮
সেন্ট্রাল প্রভিন্স ১৬ ১ ১৭
উড়িষ্যা ৯ ০ ৯
মোট ১১৭ ২০ ১৮৯

‘খ’ গ্র“প

প্রদেশ সাধারণ মুসলিম শিখ মোট
পাঞ্জাব ৮ ১৬ ৪ ২৮
উ: পশ্চিম ০ ৩ ০ ৩
সীমান্ত প্রদেশ
সিন্ধু ১ ৩ ০ ৪
মোট ৯ ২২ ৪ ৩৫

‘গ’ গ্র“প

প্রদেশ সাধারণ মুসলিম মোট
বাংলা ২৭ ৩৩ ৬০
আসাম ৭ ৩ ১০
মোট ৩৪ ৩৬ ৭০

কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের আশা-আকাঙ্খার সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা করে একটি ঐক্যবদ্ধ ভারত গঠন করা ছিল ১৬ মে’র পরিকল্পনার লক্ষ্য। কংগ্রেস আপত্তি জানায় যে, উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ হচ্ছে কংগ্রেস শাসিত। তাই মুসলিম লীগ শাসিত অন্যান্য প্রদেশের সঙ্গে এ প্রদেশ একই গ্র“পের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না। মুসলিমপ্রধান বাংলার সঙ্গে আসামের অন্তর্ভুক্তির বিরোধিতা করে বলা হয় যে, আসাম হিন্দুপ্রধান। অতএব হিন্দুপ্রধান এ প্রদেশ মুসলিমপ্রধান বাংলার সঙ্গে একই গ্র“পভুক্ত হতে পারে না। শিখরা কেবিনেট মিশনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। তারা জানিয়ে দেয় যে, মুসলিমপ্রধান অঞ্চলগুলোকে নিয়ে গঠিত ‘খ’ গ্র“পের করুণার উপর তাদের ভাগ্য ছেড়ে দেয়া হচ্ছে এবং সেখানে তাদের ধর্ম ও সংস্কৃতি বিপন্ন হবে।
কেবিনেট মিশন ৫ থেকে ১২ মে সিমলায় একটি বৈঠক আহ্বান করে। বৈঠকে কংগ্রেস থেকে চার জন এবং মুসলিম লীগ থেকে চার জন করে প্রতিনিধি পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়। কংগ্রেস থেকে বৈঠকে যারা যোগদান করেন তাদের মধ্যে ছিলেন দলের সভাপতি জওহরলাল নেহরু, চন্দ্র শেখর আজাদ, সরদার বল¬বভাই প্যাটেল ও সীমান্ত গান্ধী খান আবদুল গাফফার খান। মুসলিম লীগ থেকে যারা অংশগ্রহণ করেন তারা ছিলেন দলের প্রধান মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, সাধারণ সম্পাদক লিয়াকত আলী খান, ইসমাইল খান ও আবদুর রব নিস্তার। গান্ধীকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। ভাইসরয় লর্ড ওয়াভেল আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন। ভারতীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনার পর ১৬ মে কেবিনেট মিশন তাদের পরিকল্পনা প্রকাশ করে। কংগ্রেস তৎক্ষণাৎ ১৬ মে’র পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করে। কংগ্রেসের বিরোধিতায় মে পরিকল্পনা গৃহীত না হওয়ায় ব্রিটিশরা ১৯৪৬ সালের ১৬ জুন দ্বিতীয় একটি বিকল্প প্রস্তাব পেশ করে। বিকল্প প্রস্তাবে ভারতকে হিন্দুপ্রধান ও মুসলিমপ্রধান দু’টি রাষ্ট্রে বিভক্ত করার সুপারিশ করা হয়। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ সমঝোতায় না পৌঁছায় ভাইসরয় ওয়াভেল ১৬ জুন পরবর্তী সকল আলোচনা স্থগিত রাখেন এবং ঘোষণা করেন যে, অন্তর্বর্তী সরকার গঠনে তিনি ১৪ জন ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ জানাবেন। তাদের মধ্যে তফসিলী সম্প্রদায়সহ ৬ জন হবেন কংগ্রেসের হিন্দু সদস্য, মুসলিম লীগ থেকে নেয়া হবে ৫ জন এবং বাদবাকি তিনজনের একজন হবেন শিখ, আরেকজন হবেন পার্সী এবং তৃতীয় জন হবেন ভারতীয় খ্রিস্টান। লর্ড আর্চিবল্ড ওয়াভেল আরো ঘোষণা করেন যে, শীতকালে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং নির্বাচনের পর একটি গণপরিষদ গঠন করা হবে।
২৪ জুন কংগ্রেস কেবিনেট মিশনের প্রথম প্রস্তাব গ্রহণ করে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারে যোগদানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। কংগ্রেস অনঢ় অবস্থান গ্রহণ করায় ভাইসরয় অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রচেষ্টা থেকে বিরত হন। তবে পরবর্তীতে ৪ জুুলাই তিনি এককভাবে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করেন এবং কংগ্রেসকে সরকারে যোগদানে রাজি করানোর চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন। জিন্নাহর আপত্তি সত্ত্বেও ভাইসরয় লর্ড ওয়াভেল ১৯৪৬ সালের ১২ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠনে নেহরুকে আমন্ত্রণ জানান। ১৩ আগস্ট সরকার গঠনে সহায়তা চেয়ে নেহরু জিন্নাহর কাছে চিঠি পাঠান। ১৫ আগস্ট তিনি জিন্নাহর সঙ্গে তার বাসভবনে দেখা করেন। উভয়ের মধ্যে ৮০ মিনিট স্থায়ী বৈঠক হয়। জিন্নাহ নির্বাহী পরিষদে কংগ্রেসের সমান অংশীদারিত্ব এবং সকল মুসলিম সদস্যদের মনোনয়ন দানের অধিকার দাবি করেন। গণপরিষদে কংগ্রেসের আসন ছিল ৫৭ এবং মুসলিম লীগের ৩০। গণপরিষদে নিজেদের আসন বেশি থাকায় কংগ্রেস জিন্নাহর উভয় প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। দলটি জানিয়ে দেয় যে, প্রয়োজনবোধ করলে তারা একজন মুসলমানকে অন্তর্বর্তী সরকারে যোগদানে মনোনয়ন দেবে। ওয়াভেলের অব্যাহত প্রচেষ্টায় ১৯৪৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর নেহরু অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন। একইসঙ্গে তিনি নির্বাহী পরিষদের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসাবেও দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ৭ সপ্তাহ পর মুসলিম লীগ অন্তর্বর্তী সরকারে যোগদান করে। ২৫ অক্টোবর দপ্তর বণ্টন করা হয়। মুসলিম লীগের লিয়াকত আলী খানকে অর্থ, সরদার আবদুর রব নিস্তারকে যোগাযোগ, আই আই চুন্দ্রিগড়কে বাণিজ্য, গজনফর আলী খানকে স্বাস্থ্য ও যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলকে আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়। জিন্নাহ অন্তর্বর্তী সরকারে যোগদানে বিরত থাকেন। ব্যক্তিত্বের বিচারে তিনি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী পদে নিয়োগ লাভের জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হওয়ায় নেহরুকে এ পদে নিয়োগ দেয়া হয়। ব্রিটিশরা বুঝতে পেরেছিল যে, জিন্নাহকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী করা হলে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলন থেকে তাকে বিরত রাখা সম্ভব হবে। কংগ্রেসের চাপে তারা তাকে প্রধানমন্ত্রী পদে নিযুক্তি দানে সাহস পায়নি। তবে ব্রিটিশরা যদি জানতো যে, জিন্নাহ ক্ষয়রোগে আক্রান্ত এবং এক বছর পর তিনি মারা যাবেন তাহলে তারা ভারতকে অখণ্ড রাখার স্বার্থে তাকে প্রধানমন্ত্রী পদে নিয়োগ দিতে দ্বিধা করতো না। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৬ মে প্রণীত কেবিনেট মিশন পরিকল্পনায় সীমিত ক্ষমতাসম্পন্ন কেন্দ্রের অধীনে গ্র“প গঠনের ধারণাকে পাকিস্তান সৃষ্টির ভিত্তি হিসাবে দেখতে পেয়েছিলেন। ১৯৪৬ সালের ৬ জুন কেবিনেট মিশনের পরিকল্পনা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে দিল¬ীর ইম্পেরিয়েল হোটেলে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সভাপতিত্বে মুসলিম লীগের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী দিল¬ী বৈঠকে যোগদান করেন। বৈঠকে কেবিনেট মিশনের প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। এ প্রস্তাব গ্রহণে সোহরাওয়ার্দী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে কংগ্রেস কেবিনেট মিশনের দু’টি পরিকল্পনাই প্রত্যাখ্যান করে এবং মুসলিম লীগকে তাদের নিজস্ব ব্যাখ্যার কাছে নতি স্বীকারে অনমনীয় অবস্থান গ্রহণ করে। কংগ্রেস সভাপতি পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু বোম্বাইয়ে ১০ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে ১৬ মে প্রণীত পরিকল্পনা সম্পর্কে বলেন, ‘স্বাধীন ভারতে কোনো গ্র“প থাকবে না এবং গণপরিষদ হবে একটি সার্বভৌম প্রতিষ্ঠান। কংগ্রেস কেবলমাত্র গণপরিষদে অংশগ্রহণে সম্মত হয়েছিল। কংগ্রেস কেবিনেট মিশন পরিকল্পনা পরিবর্তন ও সংশোধনের ব্যাপারে সম্পূর্ণ স্বাধীন।’
নেহরুর এই একটি উক্তি ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। কেবিনেট মিশন পরিকল্পনা পরিত্যক্ত হয়। নেহরু কেবিনেট মিশন সম্পর্কে মুসলিম লীগের কাছে অগ্রহণযোগ্য এ উক্তি করেছিলেন মাওলানা আবুল কালামের কাছ থেকে কংগ্রেস সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণের কয়েকদিন পর। আবুল কালাম আজাদ এসময় কংগ্রেস সভাপতির আসনে অধিষ্ঠিত থাকলে ইতিহাসের চাকা ঘুরতো বিপরীত দিকে। ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, তিনি কংগ্রেস সভাপতির দায়িত্বে অধিষ্ঠিত থাকলে কখনো ভারত বিভক্তিতে সম্মত হতেন না। ভারতকে ঐক্যবদ্ধ রাখার জন্য তিনি কেবিনেট মিশন পরিকল্পনা গ্রহণ করতেন। ভারতের কট্টর হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেতা ও বিজেপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যশোবন্ত সিং তার লেখা ‘জিন্নাহ-ইন্ডিয়া,পার্টিশন, ইন্ডিপেনডেন্স’ শিরোনামে বইটি প্রকাশিত হওয়ার প্রাক্কালে ২০০৯ সালের ১৫ আগস্ট করণ থাপরের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, If the final decisions had been taken by Mahatma Gandhi, Rajaji or Maulana Azad rather than Nehru, a united India would have been attained. অর্থাৎ ‘নেহরুর পরিবর্তে মহাত্মা গান্ধী, রাজাজি, (রাজাগোপালাচারিয়া) অথবা মাওলানা আজাদ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে অখণ্ড ভারত অর্জন করা যেতো।’ যশোবন্ত সিং সত্য কথা স্বীকার করায় তাকে বিজেপি থেকে বরখাস্ত করা হয় এবং গুজরাটে তার বই বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়। ১৯ আগস্ট তার বইয়ের কপিতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। তবে তার বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে অধিকাংশ বক্তা একমত পোষণ করেন যে, জিন্নাহ ফেডারেল ব্যবস্থার অধীনে ভারতের স্বাধীনতা চেয়েছিলেন। তিনি কখনো ভারত বিভক্তির পক্ষে ছিলেন না। নেহরু ও সরদার বল¬বভাই প্যাটেল হলেন ভারত বিভক্তির মূল নায়ক। জিন্নাহর কর্মপন্থা ও কৌশলকে তারা ভুল ব্যাখ্যা করেছিলেন। ২০০৮ সালের ১০ আগস্ট বিবিসি অনলাইন পরিবেশিত ‘পার্টিশন ইন্ডিয়া অভার লাঞ্চ’ শিরোনামে প্রকাশিত একটি সংবাদে তার সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়। আলোচ্য সংবাদে যে লাঞ্চ বা মধ্যাহ্ন ভোজের কথা উলে¬খ করা হয় তাতে অংশগ্রহণ করেছিলেন ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন ও স্যার সিরিল র‌্যাডক্লিফ। র‌্যাডক্লিফের একান্ত সহকারী ক্রিস্টোফার বিউমন্টকে কৌশলে এ ভোজসভায় উপস্থিত রাখা হয়নি। মাউন্টব্যাটেন ও র‌্যাডক্লিফের মধ্যকার মধ্যাহ্ন ভোজে তাকে উপস্থিত না রাখায় তিনি কষ্ট পান। বিউমন্ট তার এসব খেদের কথা লিখে রেখে যান। বিউমন্টের ছেলে রবার্ট বিউমন্ট ভারতের ৬০তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে তার লেখা দলিলপত্র প্রকাশ করেন। বিউমন্টের দলিলপত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে বিবিসি’র এ সংবাদে বলা হয়, In a lunch between the pair in which a substantial tract of Muslim-majority territory-which should have gone to Pakistan- was instead ceded to India. Mountbatten not only bent the rules when it came to partition- he also bent the border in India’s favour.’ অর্থাৎ ‘উভয়ের মধ্যকার এক মধ্যাহ্ন ভোজে যে মুসলিমপ্রধান ভূূখণ্ড পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা ছিল সে ভূখণ্ড ভারতের কাছে ছেড়ে দেয়া হয়। মাউন্টব্যাটেন শুধু ভারত বিভক্তির রীতিনীতি পরিবর্তন করেছিলেন তাই নয়, তিনি ভারতের অনুকূলে সীমানাও পরিবর্তন করেছিলেন।’ বিবিসি’র রিপোর্টে আরো বলা হয়, The documents repeatedly allege that Mountbatten put pressure on Radcliffe to alter the boundary in India’s favour.’ অর্থাৎ ‘বিউমন্টের দলিলপত্রে বার বার অভিযোগ করা হয়েছে যে, মাউন্টব্যাটেন ভারতের অনুকূলে সীমান্ত পরিবর্তনে র‌্যাডক্লিফের উপর চাপ প্রয়োগ করেছিলেন।’
জিন্নাহর অন্যতম উপদেষ্টা ভারতীয় লেখক এমআরএ বেগ তার ‘ইন ডিফারেন্ট স্যাডলস’ নামে বইয়ে লিখেছেন, ‘১৯৩৯ সাল নাগাদ জিন্নাহর মনোজগতে পাকিস্তানের ধারণা ছিল না। তিনি হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের ধারণা থেকে উত্তরপ্রদেশে কংগ্রেস-লীগ কোয়ালিশন সরকার গঠনের প্রত্যাশা করছিলেন। কিন্তু কংগ্রেস উত্তরপ্রদেশে কোয়ালিশন সরকার গঠনে অস্বীকৃতি জানালে জিন্নাহ পাকিস্তান দাবি নিয়ে অগ্রসর হন। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সরকার গঠনের রাজনৈতিক অধিকার ব্রিটেনে পুরোপুরি প্রযোজ্য হলেও ভারতীয় বাস্তবতায় এ ধরনের সরকার গঠন করা ছিল সাম্প্রদায়িক সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমার্থক।’
ভারত বিভক্তির জন্য নেহরুকে দায়ী করে ভারতের বাইরেও একই ধরনের মতামত প্রকাশ করা হয়। কেবিনেট মিশনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ১০ জুলাই প্রদত্ত তার উক্তির ঐতিহাসিক প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে ২০০৯ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ‘নেহরু এন্ড পার্টিশন’ শিরোনামে হেরাল্ড ট্রিবিউনে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা
হয়, It actually hastened the end of the Partition drama. Thus was the fate of India decided. অর্থাৎ ‘এ উক্তি ভারত বিভক্তির শেষাঙ্ক ত্বরান্বিত করেছিল এবং এভাবে ভারতের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যায়।’ নেহরুর জীবনীকার মাইকেল ব্রাচারও অভিন্ন মত দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, It was one of the most fiery and provocative statements in Nehru’s forty years of public life. অর্থাৎ ‘ নেহরুর এ উক্তি ছিল তার ৪০ বছরের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে জ্বালাময়ী ও প্ররোচনামূলক।’
নেহরু কংগ্রেস সভাপতি হলেও দলে গান্ধীর প্রভাব ছিল অপ্রতিহত। তিনি ইচ্ছা করলে তার উক্তি নাকচ করে দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন। উপরন্তু তিনি প্রদেশগুলোকে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে গ্র“পে বিভক্ত করায় অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন এবং কেবিনেট মিশন পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান সমর্থন করেন। গান্ধীর এ মনোভাব এবং বোম্বাইয়ে নেহরু এ ঘোষণা দেয়ায় মুসলিম লীগ তাদের ইতিপূর্বের অবস্থান থেকে সরে আসে এবং বোম্বাইয়ে তিন দিনব্যাপী দলীয় পর্যায়ে আলোচনার পর ২৭ জুলাই কেবিনেট মিশন পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করে। অথচ মুসলিম লীগ প্রথমে পুরোপুরি বিনা আপত্তিতে ১৬ মে’র পরিকল্পনা মেনে নিয়েছিল।
কংগ্রেস কেবিনেট মিশনের ১৬ মে’র পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করার পরই মুসলিম লীগ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় তাদের মূল দাবিতে ফিরে যায় এবং প্রত্যক্ষ সংগ্রামের নীতি গ্রহণ করে। ১৯৪৬ সালে ভারত বিভক্তির পরিকল্পনা গ্রহণকালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বেধে যায়। ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট পাকিস্তান কায়েমের দাবিতে ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন কর্মসূচি’ পালনকালে কলকাতায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়। এখানে দাঙ্গায় ৩ হাজার হিন্দু ও ৭ হাজার মুসলমান নিহত হয়। পরে এ দাঙ্গা বিহার এবং বিহার থেকে গোটা উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় প্রায় ১ লাখ হিন্দু, মুসলমান, শিখ ও বৌদ্ধ নিহত হয়। ডাইরেক্ট অ্যাকশন কর্মসূচির বিপর্যয়ের পর বাংলায় মুসলিম লীগ কোয়ালিশন সরকারের পতনের আশংকায় দলটি কংগ্রেসের শর্তে অন্তর্বর্র্তীকালীন সরকারে যোগদান করে। শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় দ্রুত ফুরিয়ে যেতে থাকে। পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে ব্রিটিশ সরকার ১৯৪৭ সালের ১২ ফেব্র“য়ারি এডমিরাল লর্ড মাউন্টব্যাটেনকে ভারতের নয়া ভাইসরয় নিযুক্ত করে। ১২ মার্চ তিনি দিল¬ীতে এসে পৌঁছান। তাকে ১৯৪৮ সালের জুনের মধ্যে ক্ষমতা হস্তান্তর করে ভারত ত্যাগের নির্দেশ দেয়া হয়। মাউন্টব্যাটেন নির্ধারিত সময়সীমার আগেই ইংল্যান্ডে ফিরে গিয়ে ব্রিটিশ রাজকীয় নৌবাহিনীতে যোগদান করতে উদগ্রীব ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় রণাঙ্গনে মিত্রবাহিনীর সর্বাধিনায়ক। বার্মা ছিল তার সদরদপ্তর। এজন্য তাকে ‘মাউন্টব্যাটেন অব বার্মা’ বলা হতো। রাজকীয় ব্রিটিশ নৌবাহিনীতে তড়িঘড়ি করে ফিরে যাবার পেছনে তার পিতার জীবনের একটি ঘটনা তাকে ভীষণ ব্যথিত করতো। তার পিতা ছিলেন বাটেনবার্গের প্রিন্স লুই আলেক্সান্ডার। জার্মান বংশোদ্ভূত হওয়ায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালে তাকে ব্রিটিশ রাজকীয় নৌবাহিনী থেকে পদত্যাগ করতে হয়। তিনি ছিলেন তখন রয়্যাল নেভির ফার্স্ট সী লর্ড। পরবর্তীতে সমালোচনা এড়ানোর জন্য তিনি নাম থেকে জার্মান পদবি ‘বাটেনবার্গ’ বাদ দেন এবং ইংরেজ পদবি ‘মাউন্টব্যাটেন’ ব্যবহার করতে থাকেন। ছেলে লুই ফ্রান্সিস আলবার্ট মাউন্টব্যাটেনের বয়স ছিল তখন মাত্র ১৪ বছর। সেদিন মাউন্টব্যাটেন প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, তিনি ব্রিটিশ রাজকীয় নৌবাহিনীতে যোগদান করবেন এবং ফার্স্ট সী লর্ড পদে উন্নীত না হওয়া পর্যন্ত নৌবাহিনীতে অবস্থান করবেন। ভারতের ভাইসরয় হিসাবে নিযুক্তি পেয়ে এ লক্ষ্য সামনে রেখে তিনি দ্রুতগতিতে কাজ শুরু করেন। দ্রুততার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তিনি তালগোল পাকিয়ে ফেলেন। তার তাড়াহুড়োর জন্য ভারতীয়দের চড়া মাশুল দিতে হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে লর্ড মাউন্টব্যাটেন ১৯৪৭ সালের ৩ জুন ভারত বিভক্তির পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেন। ভারত বিভক্তির পরিকল্পনা তিনটি প্রধান দল কংগ্রেস, মুসলিম লীগ ও শিখ আকালি দল গ্রহণ করে।
৩ জুনের পরিকল্পনা মেনে নেয়ার আগে শিখরা তাদের সম্প্রদায়ের অধিকারের সাংবিধানিক রক্ষাকবচের নিশ্চয়তা সাপেক্ষে কংগ্রেসের সঙ্গে সহযোগিতা করে আসছিল। ১৯৪৪ সালে আকালি দলের নেতা মাস্টার তারা সিং পাকিস্তানের সঙ্গে পাঞ্জাবের অন্তর্ভুক্তির সম্ভাবনায় আতংকিত হয়ে ঘোষণা করেন যে, শিখরা একটি পৃথক জাতি এবং তাদেরকে আলাদা রাষ্ট্র গঠনের সুযোগ দিতে হবে। ১৯৪৬ সালে তিনি কেবিনেট মিশনের কাছে প্রেরিত এক চিঠিতে বলেন, আকালি দল ঐক্যবদ্ধ ভারত চায়। তবে মুসলমানদের জন্য পাকিস্তান গঠন করা হলে শিখরা পৃথক রাষ্ট্র গঠনের অধিকার দাবি করবে। চিঠিতে তার এ মতামত প্রকাশের পর আকালি দল ‘শিখিস্তান’ বা ‘খালিস্তান’ নামে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে।
পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু ও সরদার বল¬বভাই প্যাটেল ভারতকে দু’টি দেশে বিভক্ত করার পরিকল্পনায় কংগ্রেসের সম্মতি আদায় করেন। একইভাবে এ দু’জন গান্ধীর সমর্থনও আদায় করেছিলেন। ভারতের নয়া ভাইসরয় লর্ড লুই মাউন্টব্যাটেন ও ভারতীয় সিভিল সার্জেন্ট ভি পি মেনন ভারত বিভক্তির পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছিলেন।
যথাসময়ে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ নির্বাচনের জন্য মাঠে নামে। নির্বাচনের মাধ্যমে কংগ্রেস প্রমাণ করার চেষ্টা করছিল যে, তারা ধর্মমত নির্বিশেষে সকল ভারতীয়ের প্রতিনিধিত্ব করছে। অন্যদিকে মুসলিম লীগের নির্বাচনী মেনিফোস্টোতে শুধু একটি পয়েন্ট ছিল। এ পয়েন্টে ভারতীয় মুসলমানদের লক্ষ্য করে বলা হয়, ‘আপনি যদি পাকিস্তান চান তবে মুসলিম লীগকে ভোট দিন।’ ১৯৪৬ সালে অনুষ্ঠিত ভারতীয় গণপরিষদের নির্বাচনে কংগ্রেস কেন্দ্রীয় এবং অধিকাংশ প্রদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ কংগ্রেসের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসাবে পরিণত হয়। লীগ মুসলমানদের জন্য পৃথক রাষ্ট্রের দাবি জানায়। ভারতের অধিকাংশ মুসলমান লীগের দাবিকে সমর্থন করে। নেহরু ও কংগ্রেস ভারত বিভক্তি এবং ভারত বিভক্তির দাবি প্রত্যাহারের বিনিময়ে মুসলিম লীগকে অতিরিক্ত রাজনৈতিক ছাড় দেয়ার ঘোর বিরোধিতা করে।
কেবিনেট মিশন পরিকল্পনা সম্পর্কে কংগ্রেসের এসব আপত্তিতে ভারত বিভক্তি অনিবার্য হয়ে উঠে। মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ছাড়া কংগ্রেসের আর কোনো শীর্ষ নেতা কেবিনেট মিশন পরিকল্পনাকে সমর্থন করেননি। তিনি ভারত বিভক্তির জন্য দায়ী করেছেন কংগ্রেস হাইকমান্ডকে বিশেষ করে নেহরুকে। মাওলানা আজাদ বলেছেন, তিনি জিন্নাহ ও মুসলিম লীগের অভিমত মেনে নেয়ার জন্য যে প্রস্তাব পেশ করেছিলেন, কংগ্রেস হাইকমান্ড সে প্রস্তাবের প্রতি সম্মান দেখালে ভারত বিভক্তি রোধ করা যেতো। তিনি আরো বলেছেন, কংগ্রেস হাইকমান্ড কেবিনেট মিশনের ফর্মুলা প্রত্যাখ্যান করে মারাত্মক ভুল করেছে। মাওলানা আজাদ তার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘ইন্ডিয়া উইন্স ফ্রিডম’-এ এসব মন্তব্য করেছেন। তার আত্মজীবনী ও চিঠিপত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে বাংলাপিডিয়ায় বলা হয়, Azad was emphatically opposed to Nehru’s view, which according to him, led to the collapse of the Cabinet Mission Plan and eventually to the partition of India on a communal basis.’ অর্থাৎ ‘মাওলানা আজাদ ছিলেন নেহরুর দৃষ্টিভঙ্গির ঘোরতর বিরোধী। তার মতে, নেহরুর দৃষ্টিভঙ্গির দরুণ কেবিনেট মিশন ব্যর্থ হয় এবং কেবিনেট মিশন ব্যর্থ হওয়ায় সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে ভারত বিভক্ত হয়ে যায়।’
মাওলানা আজাদ তার বইয়ের ৩০টি পৃষ্ঠায় নেহরুর ভূমিকার সমালোচনা করেন। নেহরুর বিতর্কিত ভূমিকা নিয়ে লেখা ৩০পৃষ্ঠা প্রকাশের উপর তিনি ৩০ বছরের নিষেধাজ্ঞা পাকাপোক্ত করে রেখে যান। ১৯৮৭ সালে এ নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়। মাওলানা আজাদ চাননি যে, তার কিংবা নেহরুর জীবদ্দশায় এ উপাখ্যান প্রকাশিত হোক। তাই তিনি আইনগত নিষেধাজ্ঞা কামনা করেন। কত সত্যি কথাই না লিখে গেছেন মাওলানা আবুল কালাম আজাদ! কংগ্রেস সভাপতি হিসাবে নেহরু কেবিনেট মিশন পরিকল্পনা মেনে নিলে কখনো ভারত বিভক্ত হতো না।

(লেখাটি আমার ‘পলাশী থেকে একাত্তর’ থেকে নেয়া। বইটি প্রকাশ করেছে আফসার ব্রাদার্স।)