স্টাফ রিপোর্টার।।ব্যাংকবীমা২৪.কম

আগস্ট ২৭, ২০১৮

জনতা ব্যাংকে লোনের অর্ধেকই খেলাপি

সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে যা হয়েছে একে চুরি নয় ‘ডাকাতি’ ও ‘হরিলুট’ বলেই আখ্যায়িত করছেন সংশ্লিষ্টরা। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা কমিটি ও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ব্যবসায়ী নামের কতিপয় লুটেরা মিলেমিশে ভাগ-বাটোয়ারার মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর অর্থ লুটপাট করেছেন। তবে লুটপাট কান্ডে সরকারি জনতা ব্যাংক অন্যদের পেছনে ফেলে নতুন রেকর্ড গড়েছে বলে ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

দেখা যাচ্ছে ব্যাংকটির ৪৩ হাজার কোটি টাকার বেশি বিতরণ করা ঋণের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই খেলাপি হয়েছে। ফলে দেখা দিয়েছে মূলধনে বড় ঘাটতি। জনতা ব্যাংকের ভয়াবহ এমন হরিলুট কান্ডে নতুন বিস্ফোরক তথ্য ফাঁস হয়েছে। যা আবারও ব্যাংকিং খাতকে মহা ঝাঁকুনি দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুসন্ধানসহ সংশ্লিষ্ট সূত্রে বড় অঙ্কের এই দুর্নীতি ও লুটপাটসহ বিদেশে অর্থ পাচারের তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। একক মালিকানাধীন ছোট ছোট গ্রুপকে বড় অঙ্কের ঋণ ও ঋণসুবিধা দিয়ে ব্যাংকটি নিজেই এখন বড় ঝুঁকিতে পড়েছে।

জানা গেছে, ২০ হাজার কোটি টাকার ঋণ বিতরণে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছে জনতা ব্যাংকের কর্মকর্তারা নিজেরাই। ১১শ’ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ কেনার নজিরবিহীন ঘটনাও ঘটেছে। জালিয়াতির দায়ে মোহাম্মদপুর ও ইমামগঞ্জ শাখার বৈদেশিক লেনদেনের (এডি) লাইসেন্স স্থগিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ঋণ বিতরণের তুলনায় আদায় কম হওয়ায় ব্যাংকটি বড় ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে মনে করছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

তারা বলছেন, সীমাহীন অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে ব্যাংকটিকে একেবারে খাদের কিনারে নিয়ে গেছে প্রভাবশালী একটি চক্র। যারা এ ব্যাংকের বড় সুবিধাভোগী। এই চক্রটিকে সব ধরনের সহায়তা দিয়েছেন পর্দার আড়ালে থাকা রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। ফলে এক বছরের ব্যবধানে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৩ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া ব্যাংকটি নতুন করে মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে, যা নিকট অতীতে ছিল না। তা সত্ত্বেও ব্যাংকটিকে পুঁজি করে প্রভাশালীরা তাদের ব্যক্তিগত আখের গোছাতে এখনও মরিয়া।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে জনতা ব্যাংক ডুবতে আর বেশি দেরি হবে না। কোনো জবাবদিহিতা না থাকায় অপরাধীরা বারবার পার পেয়ে গেছে। মূলত শাস্তি না হওয়ায় জনতা ব্যাংকসহ পুরো ব্যাংকিং সেক্টরে বর্তমানে অরাজকতা বিরাজ করছে।সম্প্রতি নিয়ম বহির্ভূতভাবে জনতা ব্যাংকের ঋণ বিতরণসহ ঋণসুবিধার আড়ালে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকার জাল-জালিয়াতির বিস্ফোরক তথ্য ব্যাংকটির নিজস্ব অনুসন্ধান ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে। যার মধ্যে এক গ্রাহককেই দেয়া হয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি।

এর আগে চলতি বছরের শুরুর দিকে আরও সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি বিধিবহির্ভূত একক ব্যক্তিকে ঋণসুবিধা দেয়ার ঘটনা প্রকাশ পায়। সে সময়ে ব্যাপক তোলপাড় হলেও কার্যত লুটপাটে জড়িত মূলহোতাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। সেই সাথে আরও কয়েকটি ছোট গ্রুপকে বড় অঙ্কের অবৈধপন্থায় ঋণসুবিধা দেয়ার প্রমাণ মিলেছে জনতা ব্যাংকের বিরুদ্ধে। সব মিলিয়ে সরকারি এই ব্যাংকটি থেকে বর্তমান সরকারের সময়ে ২০ হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির মাধ্যমে ঋণসুবিধা দেয়ার প্রমাণ মিলেছে। যার বেশিরভাগ এখন খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে। এসব অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।

সম্প্রতি ব্যাংকটির নিজস্ব অনুসন্ধানেও এমন তথ্য বেরিয়ে এসেছে। অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়, এক ব্যক্তির মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান- ক্রিসেন্ট গ্রুপকে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যাংক ঋণসহ নানা ধরনের আর্থিক সুবিধা প্রদান করেছে জনতা ব্যাংক। যার সিংহভাগ বিদেশে পাচার করা হয়েছে। ফলে আড়াই হাজার কোটি টাকার বেশি ক্রিসেন্ট গ্রুপের খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে।

এর পেছনে জনতা ব্যাংকের ইমামগঞ্জ করপোরেট শাখার তৎকালীন ব্যবস্থাপকসহ অনেকে জড়িত থাকার তথ্য জানা গেছে। এমনকি শাখা ব্যবস্থাপকের অ্যাকাউন্টে ৬০ লাখ টাকার অস্বাভাবিক লেনদেনের প্রমাণ পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত কমিটি। এমন অভিযোগের কারণে জনতা ব্যাংকের বেশ ক’জন কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলেও মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে যাচ্ছেন।

সূত্র বলছে, জনতা ব্যাংকের ইমামগঞ্জ করপোরেট শাখার ৯৮ শতাংশ ঋণ দেওয়া হয়েছে ক্রিসেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান এমএ কাদেরকে। যার পুরোটাই এখন খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। এই ঋণ প্রদানে কোনো ধরনের ব্যাংকিং নীতি বা বিধি-বিধান মানা হয়নি। একই অভিযোগে অভিযুক্ত জনতা ব্যাংকের মোহাম্মদপুর শাখাও। লুটপাটের পেছনে সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তারা ছাড়াও ব্যাংকটির তৎকালীন চেয়ারম্যানসহ পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও একজন ডিএমডি জড়িত থাকার তথ্য মিলেছে। যদিও তারা কেউ-ই নিজেদের কাঁধে দায় নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। বরং পরস্পর পরস্পরকে দোষারোপ করার চেষ্টা করছেন লুটপাটে জড়িতরা।

এর বাইরে একই ব্যাংকের অপর আরও দু’টি শাখা থেকে আরও কয়েক হাজার কোটি টাকা দুর্নীতির মাধ্যমে হরিলুটের প্রমাণ পেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই লুটপাটের ঘটনার আগেও এক গ্রাহককে নিয়ম লঙ্ঘন করে জনতা ব্যাংকের ৫ হাজার ৫০৪ কোটি টাকার ঋণ ও ঋণসুবিধা দেওয়ার তথ্য ফাঁস হওয়ার পর গণমাধ্যমের শিরোনাম হয় জনতা ব্যাংক। যা দেশে সরকারি ব্যাংকগুলোর অর্থ কেলেঙ্কারির সবচেয়ে বড় ঘটনা। তবে সেই লুটপাটের সঙ্গে জড়িতদের এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোনো শাস্তি হয়নি। বরং একই ব্যাংকে ফের বড় ধরনের ঋণ কেলেঙ্কারির খবর পাওয়া গেল।

একের পর এক নিয়ম লঙ্ঘন করে জনতা ব্যাংক থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়ে একশ্রেণির দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় রাতারাতি ‘বড়লোক’ হয়েছেন। একই সাথে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িতরাও প্রত্যেকে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ নয়, তালগাছ হয়েছেন। ফলে সরকারি ব্যাংকটির অবস্থা এখন বেগতিক। বারবার সরকার থেকে মূলধন ঘাটতি মেটাতে প্রণোদনা দিয়েও যেন ব্যাংকটির স্বাভাবিক কার্যক্রম ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

ফের বড় ঋণ কেলেঙ্কারি

রফতানির ভুয়া নথিপত্র তৈরি করে নগদ সহায়তার বিপুল পরিমাণ অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছে জনতা ব্যাংক থেকে। একা শুধু ক্রিসেস্ট গ্রুপই এভাবে সরকারের নগদ সহায়তা তহবিল থেকে ১ হাজার ৭৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ভুয়া কাগজপত্রে। অপকর্মে সহায়তা করার পাশাপাশি ক্রিসেন্ট গ্রুপকে অর্থায়নও করেছে জনতা ব্যাংক। ক্রিসেন্টের কাছে জনতা ব্যাংকের পাওনা ২ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা। বিদেশে রফতানির ১ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা আটকা রয়েছে। সব মিলিয়ে গ্রুপটি সরকারি ব্যাংক ও সরকারের তহবিল থেকে মাত্র পাঁচ বছরেই নিয়ে নিয়েছে ৫ হাজার ১৩০ কোটি টাকা। ২০১৩ সাল থেকে এসব অনিয়মের শুরু।

জনতা ব্যাংকের নিজস্ব অনুসন্ধান ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, একই গ্রাহক তিনভাবে সরকারি আর্থিক সুবিধা ভোগ করেছেন। রফতানি বিলের টাকা বিদেশে রেখে দিয়েছেন। ব্যাংক সেই বিল কিনে গ্রাহককে নগদ টাকা দিয়েছে। আবার এসব রফতানির বিপরীতে সরকার থেকে নগদ সহায়তাও নিয়েছেন ক্রিসেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান এমএ কাদের। জনতা ব্যাংক ইমামগঞ্জ করপোরেট শাখার মাধ্যমে এ সব জালিয়াতি হয়েছে। ক্রিসেন্ট গ্রুপের পাদুকাসহ চামড়াজাত পণ্যের ব্যবসা রয়েছে। কাগজে-কলমে দেখানো হয়েছে, ক্রিসেন্ট গ্রুপ চামড়াজাত পণ্য রফতানি করেছে হংকং ও ব্যাংককে। সেই রফতানি বিল ক্রয় করে গ্রুপটিকে নগদে টাকা দিয়েছে জনতা ব্যাংক। অথচ রফতানির টাকা ফেরত আসেনি। ব্যাংক চাপ দেওয়ায় মাঝে মাঝে কিছু অর্থ এসেছে দুবাই থেকে। কিন্তু আমদানিকারক দেশ থেকে এক টাকাও আসছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, সরকার থেকে নেয়া নগদ সহায়তার টাকা দুবাই ও যুক্তরাষ্ট্রে পাচার করেছে ক্রিসেন্ট গ্রুপ। যার একক মালিক এমএ কাদের। এই গ্রুপের পরিচালনায় পরিবারের অন্য দু’জন সদস্য সুলতানা বেগম (এমডি) ও রিজিয়া বেগম (পরিচালক) এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এমএ কাদের একাই পরিচালনা করেন গ্রুপ কোম্পানিটি। যা এমএ কাদের নিজেও স্বীকার করেছেন। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, একক গ্রাহককেই বিপুল পরিমাণের এই অর্থ দিয়েছে জনতা ব্যাংক। যা নিয়ম-নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জনতা ব্যাংকের ইমামগঞ্জ করপোরেট শাখায় গ্রাহক বলতে ক্রিসেন্ট গ্রুপ একাই। শাখাটির মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ক্রিসেন্ট গ্রুপের ছয় প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যাংকের ঋণ ২ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা। যদিও ব্যাংক কোম্পানি আইনে বলা আছে, ব্যাংকে রক্ষিত মূলধনের ২৫ শতাংশের বেশি কোনো গ্রুপকে অর্থায়ন করা যায় না। কিন্তু ব্যাংকটির এই একটিশাখা থেকে ঋণ হিসেবে গেছে মূলধনের ৫৫ শতাংশ। ক্রিসেন্ট গ্রুপের ছয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ক্রিসেন্ট লেদার প্রোডাক্টস, ক্রিসেন্ট ট্যানারিজ, রূপালী কম্পোজিট লেদার, লেক্সকো লিমিটেড ও গ্লোরী এগ্রোর কর্ণধার এমএ কাদের। আর রিমেক্স ফুটওয়্যার নামে অপর একটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার তার ভাই এমএম আজিজ।

টাকা বিদেশে পাচার

প্রাপ্ত তথ্যে প্রমাণ মিলেছে, মূলত সরকারি আর্থিক সুবিধা ও ঋণের বড় অংশই বিদেশে পাচার করেছে ক্রিসেন্ট গ্রুপ। যদিও বিদেশে অর্থ পাচারের বিষয়টি অস্বীকার করে এমএ কাদের দাবি করেছেন, হাজারীবাগ থেকে সময়মতো ট্যানারি স্থানান্তর না করায় কারখানার বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। এ কারণে সময়মতো চামড়া রফতানি করা যায়নি। ফলে ‘১ হাজার ২০০ কোটির বেশি টাকা বিদেশে আটকে আছে’। হংকংয়ের প্রতিষ্ঠান চামড়া নিয়ে অন্য দেশে বিক্রি করেছে।

এ জন্য অন্য দেশ থেকে টাকা আসছে বলেও দাবি তার। তবে অনুসন্ধানে কাদেরের বক্তব্যের সত্যতা পাওয়া যায়নি। ক্রিসেন্ট গ্রুপের রফতানির ৫৭৭টি বিলের টাকা দেশে ফেরত আসেনি। যার মূল্য বাংলাদেশি টাকায় ১ হাজার ২৯৫ কোটি। এসব রফতানির প্রায় ৯০ শতাংশই কিনেছে হংকং ও থাইল্যান্ডের ৯টি প্রতিষ্ঠান। ওইসব প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় আছেন বাংলাদেশিরা। আবার পণ্য হংকংয়ে পাঠানো হলেও রফতানি বিল পাঠানো হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। অর্থাৎ রফতানির অন্তরালে অর্থ পাচার করেছে ক্রিসেন্ট গ্রুপ। যা বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তেও প্রমাণিত হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমদানি করা এসব প্রতিষ্ঠান ভুয়া। রফতানি ভর্তুকির টাকা অবৈধ উপায়ে যুক্তরাষ্ট্র ও দুবাইয়ে পাচার করে রফতানি বিলের নামে কিছু ফেরত এনেছে ক্রিসেন্ট গ্রুপ। তবে ব্যাংকটির ইমামগঞ্জ শাখার ভোল্টের সীমা ৩ কোটি টাকা। এ জন্য গ্রাহকের হিসাবে যাওয়া টাকা উত্তোলনে ব্যবহার করা হতো প্রধান কার্যালয়ের পাশের স্থানীয় শাখাকে। সব অর্থই নগদে তুলে নিয়েছে গ্রাহক। এসব টাকার একটা অংশ গেছে শেয়ারবাজার, স্পিনিং মিল ও আবাসন প্রতিষ্ঠানে।

চলতি বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি ইমামগঞ্জ শাখায় ৮১ কোটি টাকা জমা হলে সেদিনেই বেসরকারি খাতের আরেকটি ব্যাংকের সাতমসজিদ রোড শাখার ক্রিসেন্ট গ্রুপের হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। এ হিসাব থেকে বিভিন্ন সময়ে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে এইমস এবং গ্রামীণ ওয়ানের শেয়ার কেনা হয়। এ ছাড়া ইমামগঞ্জ শাখা থেকে ২০১৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত গ্রাহকের হিসাব থেকে কয়েক দফায় টাকা গেছে দুটি স্পিনিং মিল, একটি বীমা কোম্পানি, একটি শেয়ার লেনদেনকারী কোম্পানি ও সাতটি রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠানে।

এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ক্রিসেন্ট গ্রুপের ব্যবসায়িক সম্পর্ক নেই। এমএ কাদেরের দাবি, ‘কোনো টাকা অপচয় করিনি। রফতানি সহায়তা ও ব্যাংকের টাকা দিয়ে সাভারে ১৩টি কোম্পানি করা হয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠানকে টাকা দেওয়া হয়েছে এর সবই ব্যবসায়িক। কিছু টাকা শেয়ারেও গেছে। একটু সময় দিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।’

ক্রিসেন্ট গ্রুপের সঙ্গে ব্যাংক লুটে জড়িত যারা

২০১৭ সালের ২৫ অক্টোবর থেকে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে আছেন আব্দুছ ছালাম আজাদ। তার মেয়াদেই এসব লুটপাট হয়েছে। যদিও তিনি এর দায় শুধু শাখা ব্যবস্থাপকের কাঁধে চাপানোর চেষ্টা করেছেন। গণমাধ্যমকে তিনি বলেছেন, ‘শাখা ব্যবস্থাপক নিজেই এসব অপকর্ম করেছেন।’

এদিকে রফতানি বিল শাখার দায়িত্বে ছিলেন ডিএমডি মোহাম্মদ ফখরুল আলম। জনতা ব্যাংককে ডুবানোর পর গত ১২ জুন ফখরুল আলমকে কৃষি ব্যাংকে বদলি করেছে সরকার। তিনি অপকর্মের কথা স্বীকার করলেও এর দায় নিজের কাঁধে নিতে চাননি। ফখরুল আলমের ভাষ্য, ‘আমি শুধু পর্ষদ ও এমডির নির্দেশনা পালন করেছি।’ আর ২০১৪ সালের ৮ ডিসেম্বর থেকে ২০১৭ সালের ৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন সাবেক সচিব শেখ মো. ওয়াহিদ-উজ-জামান। এই দুর্নীতি ও লুটপাট তার দায়িত্ব পালনকালেই হয়েছে। কিন্তু এই চেয়ারম্যানের দাবি, এমডি, ডিএমডি পর্যায়েই বিল কেনার সিদ্ধান্ত হয়। এসবের কিছুই তিনি জানেন না।

উল্লেখ্য, জনতা ব্যাংকের এসব ঋণ কেলেঙ্কারির সময়ে ব্যাংকটির পর্ষদ সদস্য ছিলেন- সাবেক ছাত্রলীগ নেতা বলরাম পোদ্দার, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপকমিটির সাবেক সহসম্পাদক নাগিবুল ইসলাম ওরফে দীপু, টাঙ্গাইলের কালিহাতী আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশী ও যুবলীগ নেতা আবু নাসের।

জানা গেছে, ব্যাংকের ইমামগঞ্জ শাখার কর্মকর্তাদের নিজেদের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে অস্বাভাবিক লেনদেনের চিত্র পেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ২০১৫-১৭ সালে শাখার ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্বে থাকা রেজাউল করিমের ব্যাংক হিসাবে বেতন-ভাতার বাইরে ৬০ লাখ টাকা জমা ও উত্তোলনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, জালিয়াতির মাধ্যমে ক্রিসেন্ট গ্রুপকে সহায়তা করার দায়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশে ১০ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেছে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি জনতা ব্যাংকের হিসাব থেকে নগদ সহায়তার ৪০৮ কোটি টাকা কেটে সরকারের কোষাগারে জমা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ ছাড়া ইমামগঞ্জ করপোরেট শাখার বৈদেশিক ব্যবসার লাইসেন্স (এডি লাইসেন্স) স্থগিত করা হয়েছে। একই অভিযোগে মোহাম্মদপুর শাখার এডি লাইসেন্সও স্থগিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘এসব অনিয়মের মূল কারণ, আগের দোষীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা না নেয়া। বিচারহীনতার একটা সংস্কৃতি গড়ে উঠছে।’ তিনি মনে করেন, শুধু ব্যাংককে শাস্তি দিয়ে লাভ হবে না। যারা জড়িত তাদের চিহ্নিত করে কঠিন শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

জনতা ব্যাংকে ঋণ জালিয়াতির আরও প্রমাণ

জনতা ব্যাংকে ঋণ জালিয়াতির এরও কিছু প্রমাণ মিলেছে। ব্যাংক কর্মকর্তাদের সহায়তায় ১১টি প্রতিষ্ঠান এ জালিয়াতি করেছে। এর মধ্যে জনতা ভবন কর্পোরেট শাখায় ৬৫৫ কোটি এবং স্থানীয় কার্যালয় শাখায় ২৬৬ কোটি টাকা জালিয়াতির মাধ্যমে হাতিয়ে নেয়া হয়। এমনকি খেলাপি থাকাবস্থায় এ তালিকা থেকে ফের নতুন ঋণ দেয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকদের জামানতের পরিমাণ ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বেশি দেখানোর মাধ্যমেও গ্রাহককে বেশি ঋণ পাইয়ে দিতে সহযোগিতা করেছেন ব্যাংকটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। আলোচিত দুই শাখায় ২০১৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর স্থিতির ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৈরি করা একটি প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনের আলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এসব জালিয়াতির ঘটনায় ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে তারা যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন তা গ্রহণযোগ্য হয়নি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জনতা ভবন কর্পোরেট শাখায় উইন্ডো ড্রেসিং (ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে) ৯০ কোটি টাকা বেশি মুনাফা দেখানো হয়েছে। খেলাপিদের কাছ থেকে ঋণের সুদ আদায়ে ব্যর্থ হয়েও তারা অনাদায়ী সুদকে আদায় হিসেবে দেখিয়েছে। অর্থাৎ ২০১৬ সালে আয় হতে পারে ভেবে ২০১৫ সালেই তা আয় হিসেবে দেখানো হয়। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের আপত্তির মুখে পরে তা এন্ট্রি রিভার্স বা ফেরত আনা হয়েছে। অর্থাৎ ২০১৫ সালে ব্যাংকের আয় কমে গেছে ৯০ কোটি টাকা। শাখার পুনঃতফসিলকৃত কিছু ঋণের কিস্তি নিয়মিত আদায় না হওয়া সত্ত্বেও আরোপিত অনাদায়ী সুদ আয় খাতে নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শক দল এ ধরনের ৭৮ কোটি টাকা শনাক্ত করে তা ফেরত দিতে বাধ্য করেছে। ফলে এ আয়ও তাদের হিসাব থেকে বাদ দিতে হয়েছে। এর বাইরে শাখাটি মেসার্স পবন টেক্সটাইল মিলসকে অনিয়মের মাধ্যমে বড় অঙ্কের ঋণ সুবিধা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিকে ২০১২ সালের সীমাতিরিক্ত ১৯ কোটি টাকার রফতানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) থেকে ঋণ দেয়া হয়, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিবিরোধী।

গ্রাহকের ইডিএফের আওতায় ৬৬ কোটি টাকার ঋণপত্রের দায় সমন্বয় করা ফোর্সড লোনকে অযৌক্তিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পুনর্ভরণযোগ্য পিএডি (পেমেন্ট অ্যাগেইনস্ট ডকুমেন্ট) হিসেবে দেখানো হয়। এছাড়া খেলাপি গ্রাহককে নতুন করে ২০ কোটি টাকা ঋণ দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি লঙ্ঘন করেছে সরকারি একই ব্যাংকটি। যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই ৩৬ কোটি টাকার এলসি সীমা নবায়ন করা হয়েছে।

পুনঃতফসিল সুবিধা বাতিলযোগ্য হলেও জনতা ব্যাংকের ওই শাখা তা মানেনি। এর পাশাপাশি ব্যাংকটির একই শাখা মেসার্স এমবিএ গার্মেন্টস অ্যান্ড টেক্সটাইল মিলসকে অনিয়ম করে ব্যাপক ঋণ সুবিধা দিয়েছে। এর মধ্যে তথ্য গোপন করে গ্রাহকের পক্ষে ৩৯ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ ক্রয় এবং সে খেলাপি গ্রাহককে আবার বিধিবহির্ভূতভাবে নতুন করে প্রায় ১১ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। শর্ত লঙ্ঘন করে একই গ্রাহককে ৬৫ কোটি টাকার এলটিআর ও সীমাতিরিক্ত পিএডি ঋণ সুবিধা প্রদান করা হয়। গ্রাহককে পণ্য ছাড়করণের সুযোগও করে দেয় জনতা ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এলটিআর মেয়াদ উত্তীর্ণ ও খেলাপি থাকা সত্ত্বেও গ্রাহককে আরও ৫টি এলটিআর ঋণ সুবিধা দেয়া হয়েছে। আদায় অনিশ্চিত খেলাপি থাকার পরও তড়িঘড়ি করে গ্রাহকের ১৭০ কোটি টাকা ঋণ অবলোপনের জন্য প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয় জনতা ব্যাংকের একটি শাখা থেকে।

শাখাটি মেসার্স এ্যালাইড ফার্মাসিউটিক্যালকেও অনিয়মের মাধ্যমে দিয়েছে বড় অঙ্কের ঋণ। গ্রাহক থেকে ১৫ শতাংশ কম্প্রোমাইজ অ্যামাউন্ট গ্রহণ না করেই নতুন করে সিসি (হাইপো) ঋণসীমা ১০ কোটি এবং এলসিসীমা ৮ কোটি টাকা অনুমোদন করা হয়, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

একই গ্রাহক থেকে প্রযোজ্য হারে ডাউন পেমেন্ট না নিয়ে ২০ কোটি টাকা তৃতীয়বার পুনঃতফসিল এবং মেয়াদি ঋণে রূপান্তরিত সিসি (হাইপো) ঋণ ৮ কোটি টাকা দ্বিতীয়বার পুনঃতফসিলের অনুমোদন দেয়া ছিল নিয়মের লঙ্ঘন। একইভাবে মেসার্স জেএমআই হসপিটাল অ্যান্ড রিকুইজিট ম্যানুফ্যাকচারিং লিমিটেড ও মেসার্স জেএমআই সিরিঞ্জ অ্যান্ড কেমিক্যাল ডিভাইসেসকে নিয়মবহির্ভূতভাবে বিপুল অঙ্কের ঋণ সুবিধা দিয়েছে জনতা ভবন কর্পোরেট শাখা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশদ পরিদর্শনে আরও দেখা যায়, জনতা ব্যাংকের স্থানীয় কার্যালয় শাখায়ও উইন্ডো ড্রেসিং করে ৭৩ কোটি টাকার জালিয়াতি করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, মেসার্স আনন্দ শিপইয়ার্ড অ্যান্ড স্লিপওয়েজ লিমিটেড, মেসার্স সিক্স সিজনস লিমিটেড এবং মেসার্স ফিনকোলি অ্যাপারেলসের পুনঃতফসিলকৃত ঋণে আরোপিত অনাদায়ী সুদ প্রায় ১৬ কোটি টাকা ২০১৬ সালে আদায় হবে ভেবে ২০১৫ সালে আয় দেখানো হয়।

একইভাবে রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসার্স লিতুন ফেব্রিক্সের ২৮ কোটি এবং মেসার্স বেক্সিমকো লিমিটেডের প্রায় ৩০ কোটি টাকা আয় খাতে নেয়া হয়। যা সম্পূর্ণভাবে জালিয়াতি হিসেবে চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এভাবে ঋণ দেয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কৈফিয়ত তলব করেছে। কিন্তু তাতে কোনো সন্তোষজনক জবাব মেলেনি। পরে ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ছোট গ্রুপকে বড় অঙ্কের ঋণ

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধি অনুযায়ী, কোনো ব্যাংক তাদের মূলধনের ২৫ শতাংশের বেশি কোনো একক গ্রাহককে ঋণ দিতে পারে না। জনতা ব্যাংক কয়েকটি ছোট শিল্প গ্রুপকে এই সীমা অতিরিক্ত বড় অঙ্কের ঋণ দিয়েছে। এর মধ্যে এননটেক্সকে দিয়েছে ৫৬ শতাংশ, ক্রিসেন্ট গ্রুপকে দিয়েছে ৫৫ শতাংশ, রতনপুর গ্রুপকে ২৭ শতাংশ, এমআর গ্রুপকে ২৯ শতাংশ, থার্মেক্স গ্রুপকে ৩২ শতাংশ।

টাকার অঙ্কে এননটেক্স গ্রুপের নামে জনতা ব্যাংকের ঋণ রয়েছে ৫ হাজার ৫১০ কোটি টাকা। রতনপুর গ্রুপের নামে রয়েছে ৭০০ কোটি টাকার ঋণ। এমআর গ্রুপের রয়েছে ৬৫০ কোটি টাকা। এসএ গ্রুপের রয়েছে ২৩০ কোটি টাকা। থার্মেক্স গ্রুপের রয়েছে ৮৭০ কোটি টাকা। এ ঋণগুলো দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংক প্রচলিত নিয়মনীতির তোয়াক্কা করেনি। এসব ঋণও ব্যাংকের জন্য ঝুঁকি তৈরি করেছে।

এর আগে বিসমিল্লাহ গ্রুপকে ব্যাংকের তিনটি শাখা থেকে ৫৫০ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়েছে। ওই ঋণ নিয়ে গ্রাহক বিদেশে পালিয়ে গেছেন। ঋণের টাকা পাচার করে দেয়া হয়েছে।

বারাকাত-আমিনুর লুটপাটকাণ্ড

এর আগে জনতা ব্যাংকে আবুল বারাকাত চেয়ারম্যান ও আমিনুর রহমান এমডি থাকাকালে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়। আওয়ামী লীগের এক ব্যক্তির মালিকানাধীন ২২ প্রতিষ্ঠানে ৬ বছরের ব্যবধানে ৫ হাজার ৫০৪ কোটি টাকার ঋণ ও ঋণসুবিধা দেয়া হয়েছে। যার মধ্যে ৫ হাজার কোটি টাকা খেলাপিতে পরিণত হয়। ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবুল বারাকাতের ছত্রছায়ায় এ লুটপাট হয়।

ব্যাংকটির তখনকার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুর রহমানও এ অপকর্মের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। মূলত বারাকাত-আমিনুর যৌথভাবেই ব্যাংকটিতে এ লুটপাট চালিয়েছেন। ২০০৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বর থেকে ৫ বছর জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন আবুল বারাকাত। আমিনুরও সেই পর্যন্ত ব্যাংকটিতে এমডি পদে ছিলেন।

ব্যাংক দেখভাল করার দায়িত্ব যাদের, সরকারের নিয়োগ দেয়া সেই পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কমিটিই সরকারি এই ব্যাংকটির অর্থ বিপজ্জনক হরিলুটের কাজটি করছেন। হলমার্ক ও বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির পর সাধারণ মানুষের আমানত নিয়ে ভয়ঙ্কর কারসাজির আরেকটি বড় উদাহরণ এখন জনতা ব্যাংক।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সরকারি জনতা ব্যাংক- একটি গ্রুপকে ঋণ দেয় খেয়ালখুশি মতো। ব্যাংকের উদার আনুকূল্য পাওয়া এই গ্রাহক হচ্ছেন এননটেক্স গ্রুপের মালিক মো. ইউনুস (বাদল)। তিনি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালকও (এমডি)। তারই স্বার্থসংশ্লিষ্ট ২২ প্রতিষ্ঠানের নামে এসব ঋণ নেয়া হয়। ব্যাংক ঋণের টাকায়ই এ প্রতিষ্ঠানগুলো একের পর এক গড়ে উঠে এবং ইউনুস রাতারাতি বৃহৎ শিল্পপতি বনে যান। এক সময়ের বাসশ্রমিক এই ইউনুস। পরে আওয়ামী শ্রমিক লীগের নেতা। দল ক্ষমতায় আসার পর সফল উদ্যোক্তা। এখন শিল্পপতি। মূল ব্যবসা বস্ত্র উৎপাদন ও পোশাক রফতানি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে মতে, চলতি বছরের শুরুর দিকে এননটেক্সের নামে জনতা ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারির এই তথ্য ফাঁস হলেও কার্যত এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কারোরই উল্লেখযোগ্য কোনো শাস্তি পেতে হয়নি। এমনকি মূলহোতাদের আইনের মুখোমুখি করার উদ্যোগও নেয়া হয়নি। এরই মধ্যে দ্বিতীয় দফায় ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি লুটপাটের তথ্য ফাঁস হলো।

এসব অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ না থাকলেও জনগণের ট্যাক্সের টাকা থেকে সরকার এসব ব্যাংককে মূলধন ঘাটতি পুরণ তথা লুটপাটের ভর্তুকি দিয়ে যাচ্ছে প্রতিবছর। এতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ, সুশীল সমাজ, ব্যবসায়ী নেতাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। তারা বলছেন, ‘ব্যাংক ডাকাতদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনতে হবে। দুর্নীতি-লুটপাটকে লাগামহীনভাবে ছেড়ে দেয়াও দুর্নীতির অংশ। যে দায়-দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে।’

বড় ধরনের ঝুঁকিতে জনতা ব্যাংক

খেলাপি সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত জনতা ব্যাংক ঋণ বিতরণ করেছে ৪৩ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে ৯ হাজার ৭০২ কোটি ৪১ লাখ টাকা। গত বছরের একই সময়ে ব্যাংকটির ঋণ বিতরণের পরিমাণ ছিল ৩৬ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ছিল ৬ হাজার ৫০৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।

সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩ হাজার ১৯২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। চলতি বছরের মার্চ শেষে জনতা ব্যাংক ১ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে। ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়ে যাওয়ায় বেহাল এ অবস্থা দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ‘এর মধ্যে নিশ্চয়ই বড় বড় প্রভাবশালী লোকজন জড়িত। তবে আমি মনে করি, যারা এ কাজে সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা করেছে, তাদের সবাইকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে।’