স্টাফ করেসপন্ডেন্ট ।।ব্যাংকবীমা২৪.কম

জুন ১, ২০১৮

দেড় শতাধিক নিয়োগে অবিশ্বাস্য জালিয়াতি

আবেদন না করেই চাকরি পেয়েছেন মো. ফেরদৌস গাজী। যেনতেন নয়, সরকারি চাকরি। তাও সায়েন্স ল্যাবরেটরির (বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ) মতো প্রতিষ্ঠানে। অনেক অবিশ্বাস্য অনিয়ম-অপকর্ম হয়েছে এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায়। সরকারি চাকরির বয়স ছিলো না মোছা: আছমা খানমের। ভোটার আইডি কার্ড পরিবর্তনের মাধ্যমে বয়স কমানোয় তারও হয়ে গেছে চাকরি।

আনসারের ট্রেনিং নেননি। চাকরিও করেননি কোনোদিন। তার চাকরিটিও হয়েছে আনসার কোটায়। এভাবেই ‘অসম্ভব’কে ‘সম্ভব’ করে তোলা হয়েছে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (সায়েন্স ল্যাবরেটরি) নিয়োগ প্রক্রিয়ায়। একজন-দুজন নয়। সম্প্রতি দেড় শতাধিক শূন্যপদে নিয়োগে ঘটেছে এরকমের অবিশ্বাস্য দুর্নীতি ও জালিয়াতির ঘটনা। বিপরীতে নিয়োগ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার তথ্য মিলেছে। চাঞ্চল্যকর এ দুর্নীতির তথ্য বেরিয়ে এসেছে অনুসন্ধানে। সরকারি অন্য কোনো সংস্থার মাধ্যমে সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্ত হলে আরো তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে বলে জানিয়েছে সূত্র।

রেকর্ডপত্রে দেখা যায়, ১২ ধরনের ১৭৯টি শূন্য পদ পূরণে ২০১৭ সালের ১০ জানুয়ারি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে সায়েন্স ল্যাবরেটরি। প্রতিষ্ঠানের সচিব (উপ-সচিব) মো. খলিলুর রহমানের স্বাক্ষরে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে জুনিয়র মেকানিক পদে ২ জন, টেকনিশিয়ান পদে ৩ জন, জুনিয়র টেকনিশিয়ান পদে ২২ জন, স্টেনোটাইপিস্ট পদে ১ জন, এলডিএ কাম টাইপিস্ট অথবা টেকনিক্যাল টাইপিস্ট পদে ৪১ জন, টেলিফোন অপারেটর পদে ৩ জন, সিকিউরিটি গার্ড পদে ১৮ জন, অফিস সহায়ক (এমএলএসএস) পদে ২৭ জন, প্লাম্বিং হেলপার পদে ৩ জন, ইলেকট্রিক হেলপার পদে ৪ জন, মালি পদে ৬ জন এবং ল্যাব অ্যাটেনডেন্ট বা পিপি অ্যাটেনডেন্ট অথবা হেলপার পদে ৪৯ জনসহ মোট ১৭৯ জন।

রাজস্বখাতের এ পদগুলো পূরণে প্রার্থীদের যোগ্যতা চাওয়া হয় অষ্টম শ্রেণি থেকে উচ্চ মাধ্যমিক বা সংশ্লিষ্ট পদের জন্য ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারী। কয়েকটি পদে টাইপ করার দক্ষতা ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়। বয়স নির্ধারণ করে দেয়া হয় ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি ১৮ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধা কোটায় আবেদনকারীর ক্ষেত্রে বয়সসীমা ৩২ বছর। পদগুলোর বেতন স্কেল ৮ হাজার ২৫০ থেকে ২৬ হাজার ৫৯০ টাকা। সূত্র বলছে, বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী সব পদেই চাকরি দেয়া হয়েছে লিখিত পরীক্ষা ছাড়া। এমনকি অনেকের নেয়া হয়েছে পাতানো ‘ভাইবা’। কেউ কেউ চাকরি পেয়েছেন আবেদন না করেই।

রেকর্ডে আরো দেখা যায়, নিরাপত্তাকর্মী পদে আনসার কোটায় চাকরি হয়েছে মুন্সিগঞ্জের মো. সাইদুর রহমানের (রোল-২০১৩১৬)। তার দাখিলকৃত কাগজপত্রের মধ্যে আনসারে চাকরি করেছেন-মর্মে সার্টিফিকেট নেই। তার কোনো প্রশিক্ষণও নেই। এলডিএ কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে চাকরি হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জুলহাস আহমেদের (রোল-৫২১৪)। তিনি কম্পিউটার না জানলেও পরীক্ষা ছাড়াই লিখিত, মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষায় তাকে ‘উত্তীর্ণ’ দেখিয়ে চাকরি দেয়া হয়েছে। সায়েন্স ল্যাবরেটরির সচিব মো. খলিলুর রহমানের বাসার কাজের বুয়া ছিলেন ময়মনসিংহের নূরজাহান নূরী (রোল-১৯৯৯৪)। তাকে মালি পদে চাকরি দিয়ে কাজ করাচ্ছেন খলিলুর রহমানের নিজের বাসায়। নূরীর ভাই বাবুল হাসানকেও চাকরি দেয়া হয়েছে মালি পদে।

খলিলুর রহমানের ড্রাইভার ইব্রাহিম মুসলিমের ছেলে নূরুন্নবীকে নিয়োগ দেয়া হয় টেলিফোন অপারেটর হিসেবে। ইব্রাহিম মুসলিমের ভাতিজা সবুজ মিয়াও (রোল-১৯৯৭৬) চাকরি পান মালি পদে। বরিশালের মোছা. আছমা খানমের (রোল-১৩৯২৭) বয়স ছিলো না সরকারি চাকরি নেয়ার। বয়স কমানোর জন্য তার ভোটার আইডি কার্ড পরিবর্তন করানো হয়। তিনি ল্যাবরেটরি এটেনডেন্ট পদে চাকরি করছেন বলে জানা গেছে। তথ্য মিলেছে, চাকরির জন্য আবেদনই করেননি ফেরদৌস গাজী (রোল-২০১৩৯)। পে-অর্ডারও দেননি। এমনকি মৌখিক পরীক্ষায়ও তাকে ডাকা হয়নি। তবু তার চাকরি হয়েছে নিরাপত্তা প্রহরী পদে। তিনি সায়েন্স ল্যাবরেটরির চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদের ভাতিজা বলে জানা গেছে। বর্তমানে চেয়ারম্যানের দফতরেই তিনি কর্মরত।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া। নিয়োগের কমিটি থাকলেও সেটি ছিলো সিন্ডিকেটেরই পাতানো। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একেকটি নিয়োগের বিপরীতে হাতিয়ে নেয়া হয়েছে ৫ থেকে ৮ লাখ টাকা। চাকরি পেয়েছেন যারা এদের মধ্যে দু’একজন বাদে অধিকাংশকেই ঘুষ দিতে হয়েছে। এভাবে দেড় শতাধিক জনবল নিয়োগে হাতিয়ে নেয়া হয়েছে ৮ থেকে ১০ কোটি টাকা। অত্যন্ত দক্ষতার সাথে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও পাতায় পাতায় রয়ে গেছে দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রমাণ। প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্যেই রয়েছে বহু গরমিল।

তথ্যমতে, বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরিপ্রেক্ষিতে আবেদনকারীদের একটি প্রাথমিক বাছাই হয়। বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের সচিব মো. খলিলুর রহমান ২০১৭ সালের ৩০ এপ্রিল সিকিউরিটি গার্ড পদে মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেয়ার জন্য একটি তালিকা প্রকাশ করেন। ওই তালিকাটি ছিলো বাছাইয়ে উত্তীর্ণ এবং যারা প্রবেশপত্র পেয়েছেন শুধু তাদের। তবে তালিকাভুক্তদের মধ্য থেকে যারা ১৬ মে ২০১৭ তারিখের মধ্যে প্রবেশপত্র পাননি তাদেরকে ২ কপি সত্যায়িত ফটোসহ ১৭ ও ১৮ মে’র মধ্যে পরিষদ সচিব দফতরে উপস্থিত হয়ে প্রবেশপত্র সংগ্রহ করতে বলা হয়। সেই অনুযায়ী ২০ মে সকাল সাড়ে ৯টায় সিকিউরিটি গার্ড প্রার্থীদের ২০১০১-২০২৪০ নম্বর রোলের মৌখিক পরীক্ষা হয়।

একই দিন আড়াইটায় নেয়া হয় ২০২৪১-২০৩৩৪ রোল নম্বরের পরীক্ষা। মৌখিক পরীক্ষার এ তালিকায় ২০১৩৯ নম্বরের কোনো রোল নেই। ‘ফেরদৌস গাজী’ নামক কোনো প্রার্থীও নেই। অথচ নিয়োগের পর ২০১৭ সালের ২১ আগস্ট পদায়নের প্রজ্ঞাপনে ফেরদৌস গাজী ৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে কর্মস্থলে যোগ দিতে বলা হয়। অভিযোগ রয়েছে, চাচা সায়েন্স ল্যাবরেটরির শীর্ষ কর্মকর্তা হওয়ায় ভাতিজা ফেরদৌস গাজী কোনো আবেদন ছাড়াই এ চাকরি পান। তাকে পদায়নও করা হয় চাচার কার্যালয়ে। আনসার না হলেও এ কোটায় চাকরি পাওয়া সাইদুর রহমানকেও পদায়ন করা হয়েছে চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে। দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া প্রায় সব সিকিউরিটি গার্ড, মালিকে পদায়ন করা হয়েছে নিয়োগ কমিটি সদস্যদেরই সুবিধা মতো জায়গায়।

জানা গেছে, নিয়োগ কমিটির প্রধান ছিলেন যুগ্ম-সচিব আব্দুল মাবুদ। অভিযোগ রয়েছে, তিনিসহ নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি অনিয়মে জড়িত ছিলেন আরও ৩ কর্মকর্তা। এর মধ্যে একজন হলেন- বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব ড. ইউনূস আলী প্রমাণিক। তিনি নিয়োগ কমিটিতে মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি হিসেবে ছিলেন। এই নিয়োগে অনিয়মের কারণে তার বিরুদ্ধে তদন্তও হয়। তবে অদৃশ্য ইশারায় তিনি পার পেয়ে যান। অপর দুজন হলেন, কমিটির সদস্য সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে কর্মরত উপ-সচিব বেনজির আহমেদ এবং সচিব মো. খলিলুর রহমান। আর ভাতিজাসহ নিজের পছন্দের কয়েকজনকে নিয়োগ করিয়ে নিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়াম্যান ফারুক আহমেদ।

বৃহৎ এ নিয়োগে অনিয়ম সম্পর্কে জানতে চাইলে নিয়োগ কমিটির প্রধান বিসিএসআইআর’র সদস্য (প্রশাসন) মো. আব্দুল মাবুদ প্রথমে নিয়োগের সঙ্গে নিজের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেন। পরবর্তীতে বলেন, এ নিয়োগের আগে ইডেন কলেজে লিখিত পরীক্ষা নেয়া হয়েছে। পাতানো ভাইবা নেয়া হয়েছে-এ তথ্যটিও সঠিক নয়। যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নিয়মানুযায়ী গঠিত ডিপিসি মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণ করেছে বলে তিনি দাবি করেন। শীর্ষকাগজের সৌজন্য ।