ডেস্ক।। ব্যাংকবীমা২৪.কম

মে ২৩, ২০১৮

তুরস্কে রমজান পালিত হয় ভিন্ন আমেজে

তুরস্কের ইস্তাম্বুলের বিখ্যাত মসলা বাজার। যা উসমানিয়া সাম্রাজ্যের আমলে থেকে চালু দু’টি বাজারের একটি। ২০১৩ সাল থেকে পুনঃনির্মাণের জন্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। সম্প্রতি রমজান উপলক্ষে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যিপ এরদোগান এ বাজারের উদ্বোধন করেন।

স্পাইস বাজার বা মিসরিয় বাজার নামে এটা তুর্কিদের কাছে বিখ্যাত। বাজারটি পুনঃনির্মাণের জন্য বন্ধ করে দেওয়ার পরও প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক তা দেখতে আসতেন। এই বাজার নানা কিসিমের মসলা ও তুরস্কের বিভিন্ন ধরনের মিষ্টান্ন, সবজি ও খাবারের জন্য বিখ্যাত।

প্রেসিডেন্ট এরদোগানের মতে, এই বাজার ৩৫৪ বছরের ঐতিহ্য। তিনি প্রেসিডেন্ট ও রাজনীতি শুরুর আগে এখানে ব্যবসা করতেন। এই বাজারে এরদোগানের একটি খাবারের দোকান ছিল।

আসন্ন রমজানের আমেজ ও বাজার ধরতে মসলা বাজারটি দ্রুত উদ্বোধন করা হয়েছে। কারণ তুরস্কের রমজান ভিন্ন এক আবহের সৃষ্টি করে। ইবাদত-বন্দেগি থেকে শুরু করে রমজানজুড়ে কোরআন তেলাওয়াতের জান্নাতি আমেজ বিরাজ করে দেশটিতে।

প্রতিবেশি ও আত্মীয়-স্বজনদের ইফতার বিতরণ তাদের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। এক সময়কার মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্বদানকারী তুরস্কে দীর্ঘদিন ধরে ইসলামি বিধি-বিধান পালনে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও এখন সময় পাল্টেছে। ধর্ম-কর্ম পালনে বেশ তৎপর দেশটির মুসলমানরা। ইসলামের প্রতি তাদের অপরিসীম অনুরাগ দেখতে পাওয়া যায় পবিত্র রমজান মাসে।

যুগ যুগ ধরে এশিয়া ও ইউরোপের মানুষদের চলাচলের সেতু হিসেবে কাজ করা ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত এই দেশের নাগরিকেরা রমজান মাসকে আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সেতুবন্ধনের সুযোগ বলে মনে করেন।

নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন’ বা ন্যাটোর একমাত্র মুসলিম সদস্য তুরস্কের ধর্মীয় এজেন্সির রিপোর্ট মতে দেশটিতে প্রায় ৭৭ হাজার মসজিদ রয়েছে। এসব মসজিদে সুরেলা কণ্ঠে কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে উঠে রমজানের মাহাত্ম্য।

তুর্কি মুসলমানরা ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় রমজানে পরিবারের সবাই মিলে কোরআন খতম করেন। ইস্তাম্বুল শহরের ঐতিহাসিক ‘তুবকাবি’ ভবনে পুরো রমজান মাসে রাত-দিন সর্বক্ষণ কোরআনে কারিমের তেলাওয়াতে জান্নাতি আমেজ বইতে থাকে। এক মুহূর্তের জন্যও তা বন্ধ হয় না।

বলা হয়, ‘কোরআন নাজিল হয়েছে সৌদিতে, পড়া হয় মিসরে এবং লেখা হয় তুরস্কে।’ তাই তো দেখা যায়, রমজানবিষয়ক বিভিন্ন আয়াত ও হাদিস সম্বলিত সাইনবোর্ড ও বিলবোর্ড টানানো হয় আঙ্কারা জামে মসজিদ, সুলতান আহমদ জামে মসজিদসহ সড়ক-মহাসড়কে।

কোরআনে কারিম তেলাওয়াত ও প্রচার-প্রসারের পাশাপাশি রমজানে দান-দক্ষিণার হারও বাড়িয়ে দেয় তারা। অনেক সাহায্য সংস্থা রমজানে তাদের সহযোগিতার পরিমাণ তিনগুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়। শ্রমজীবী মানুষের প্রতি মালিকেরা সদয় আচরণ করেন। একসঙ্গে বসে ইফতার করেন, তাদের কাজের ভার কমিয়ে দেন।

তুরস্কে সচরাচর টুকরো পনির ও সংরক্ষিত মাংসের টুকরো, সবজির আচার ও জ্যামের মতো হালকা খাবার দিয়ে ইফতার করা হয়। মাগরিবের নামাজের পর তারা স্যুপ, পিঠা, সবজি, শস্য আর মাংস খেয়ে থাকেন। ফল, পেস্ট্রি, পুডিং, ক্যান্ডি ও কফি ডেজার্ট হিসেবে পরিবেশন করা হয়। এ ছাড়া ইফতারে ‘রমজান কিবাবি’ নামে একটা বিশেষ ধরনের কাবাব খেয়ে থাকে তুর্কিরা।

রমজানের একটি জনপ্রিয় খাবার- যা ক্যারামেল করা পেঁয়াজ দিয়ে রমজান মাসের ১৫ তারিখে উসমানিয়া সুলতানরা খেতেন বলে কথিত আছে। ইস্তাম্বুলের ‘ফাতেহ জাদুঘর’-এ সংরক্ষিত একটি জুব্বা দেখে এসে তিনি এই খাবারটি খেতেন। জুব্বাটি হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বলে ধারণা করা হয়। এটি দেখতে বিশ্বের বহু দেশ থেকে পর্যটকরা ভিড় করেন।

রমজান মাসে তুরস্কের সরকার রমজানকেন্দ্রিক বিভিন্ন মেলার আয়োজন করে। যারা রমজানের ইফতারের খরচ জোগাড় করতে পারে না কিংবা যেসব কর্মচারি ইফতারের সময় ঘরে ফিরতে পারে না, তাদের জন্যে সরকার বিনা মূল্যে ভাত ও মাংসের ব্যবস্থা করে।

তুরস্কে ঈদ উপলক্ষে রাষ্ট্রীয়ভাবে ছুটি দেওয়া হয়। ঈদকে কেন্দ্র করে ইস্তাম্বুলের ব্লু মসজিদের মিনার থেকে শুরু করে পুরো মসজিদ বিভিন্ন রকমের আলোকসজ্জায় সাজানো হয়।ঈদের দিনে অনেকেই কবরস্থানে গিয়ে তাদের পূর্বসূরিদের জন্য দোয়া করেন।

ঈদের দিন বিশেষ কায়দায় প্রবীণদের শ্রদ্ধা জানানো হয়। প্রথাটি হলো- যিনি শ্রদ্ধা জানাবেন, তিনি প্রথমে ওই প্রবীণ ব্যক্তির ডান হাতে চুমু দেবেন এবং সেই হাতটি তার কপালে ছুঁইয়ে ঈদের শুভেচ্ছা জানাবেন।